Wednesday, August 27th, 2014

ফুলবাড়ি দিবসের ডাক

প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশকে বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফার আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার যে লড়াই বাংলাদেশে চলমান, ২৬ আগস্ট, ২০০৬ সালে সংগঠিত ফুলবাড়ি গণঅভ্যুত্থান তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সারা দুনিয়ায় বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফার স্বার্থে উন্মুক্ত খননের ধ্বংসযজ্ঞের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে আছে, তা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ফুলবাড়ি গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে ফুলবাড়ির জনগণ শুধু নিজেদের এলাকা নয়, বাংলাদেশের গোটা উত্তরবঙ্গকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।

কলম্বিয়ার কেরেজন নামের উন্মুক্ত কয়লা খনিটি চালু হয় ১৯৮৩ সালে। এরপর থেকে প্রতি বছর ১,৪৮২ একর করে ভূমি উন্মুক্ত খনন করা হয়েছে, যার ফলে আদিবাসী ওয়েউ এবং আফ্রো-কলম্বিয়ান সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। কলম্বিয়ার সবচেয়ে বড় আদিবাসী সম্প্রদায় ওয়েউরা জনগোষ্ঠীকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল খনি কোম্পানি আসলেই তাদের জীবনযাত্রার উন্নয়ন সাধন করবে। কিন্তু একসময় এলাকাবাসী দেখলেন, উন্নয়ন তো দূরের কথা, তারা আবাসস্থল থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছেন, বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, শব্দদূষণে ধবংস হয়ে যাচ্ছে তাদের সাধের গ্রাম-শহর।

অষ্ট্রেলিয়ার হান্টার ভ্যালির উন্মুক্ত খনির ফলে এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানি ও বোর ওয়াটার কমে গেছে এবং কুয়া উধাও হয়ে গিয়েছে। মাটির পানি ধারণকারী স্তর বা অ্যাকুইফারে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে, নদীর স্রোতের সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির সংযোগ নষ্ট হচ্ছে এবং এসিড মাইন ড্রেনেজের মতো ঘটনা ঘটছে।

জার্মানিতে উন্মুক্ত কয়লা খনির ফলে শুধু লুসাটিনিয়ান মাইনিং এলাকা থেকেই এ পর্যন্ত ১৩৬ সম্প্রদায়ের ২৫ হাজার মানুষকে স্থানান্তরিত করতে হয়েছে, যার মধ্যে ৮১ সম্প্রদায় একেবারেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সোর্ব সাংস্কৃতিক সংগঠন ’দমোভিনা’র হিসাবে, ১৯২৪ সাল থেকে লুসাটিনিয়া অঞ্চলে উন্মুক্ত খনির ফলে মোট ১২৩ গ্রাম ধ্বংস হয়েছে।

ওই এলাকার পানির অম্লত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। এই অধিক অম্লত্বের পানিতে মাছ কিংবা জলজ উদ্ভিদ কোনোটিই ভালো হয় না। এমনকি এই মরা পানি অঞ্চলে পর্যটন শিল্পও গড়ে তোলা যায়নি। শুধু তাই নয়, আবর্জনা ও কয়লা খনির অবশেষ ফেলে খনি এলাকা পুনরায় ভরাট করে সেখানে চাষাবাদ বা বসতি নির্মাণের চেষ্টাও সফল হয়নি, যে কারণে ইদানিং পরিত্যক্ত উন্মুক্ত খনি এলাকায় সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে।

প্রতিবেশি দেশ ভারতের ঝরিয়া, হাজারীবাগ কিংবা সিংগ্রুলি এলাকার উন্মুক্ত কয়লা খনির ফলে স্থানীয় জনগণকে বার বার উচ্ছেদ করা হয়েছে। উন্নত আবাস, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল কিন্তু রাখা হয়নি। খাবার ও ব্যবহারযোগ্য পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষিজমি গেছে, আবাদ হয় না। কাজও গেছে। অসুস্থতা চিরস্থায়ী। জন্মগতভাবে পঙ্গু হচ্ছে অনেক শিশু।

অষ্ট্রেলিয়া, কলম্বিয়া, জর্মানি কিংবা পার্শ্ববর্তী ভারতে উন্মুক্ত কয়লা খননের ধ্বংসযজ্ঞের এই অভিজ্ঞতা সামনে নিয়ে আমরা যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই, যদি ওইসব অঞ্চলের পাথুরে অনুর্বর মাটির বিপরীতে বাংলাদেশের নরম, উর্বর মাটির কথা ভাবি, তাদের সীমিত পানিসম্পদের বিপরীতে বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানিসম্পদের বিশালত্বের কথাটি মাথায় রাখি, যদি অঞ্চলগুলোর জনবসতির ঘনত্বের সঙ্গে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব তুলনা করি (প্রতি বর্গ কিমিতে বাংলাদেশে জনসংখ্যা যেখানে ১২০৩, সেখানে অষ্ট্রেলিয়ার ৩, কলম্বিয়ার ৪৪, জার্মানিতে ২৩১ এবং ভারতে ৪২১) তাহলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ফূলবাড়িতে এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত কয়লা খননের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ওখানকার জনগণ গোটা উত্তরবঙ্গকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন!

২. ফুলবাড়ি গণঅভ্যুত্থানের এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল এই অভ্যুত্থান দপ করে জ্বলে ওঠা আগুনের মতো হঠাৎ নিভে যায়নি, কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণের সংহতির বন্ধন আরও মজবুত করেছে, স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের সপক্ষের রাজনৈতিক শক্তির বিকাশের রাস্তা তৈরি করেছে, ফুলবাড়ির প্রতিরোধের সঙ্গে সারা দেশের মানুষকে শরিক করেছে, স্থানীয় প্রতিরোধকে জাতীয়, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চলমান আন্তর্জাতিক প্রতিরোধের সঙ্গেও যুক্ত করে দিন দিন ফুলবাড়ির চেতনা আরও মজবুত করেছে। ফলে বহুজাতিক এশিয়া এনার্জি ও তার দেশীয় লবিস্টদের নানামুখী তৎরতার বিরুদ্ধে সেখানকার জনগণকে ২৬ আগস্টের পরও বার বারই ফুঁসে উঠতে দেখা গেছে ।

এই যেমন ২০১২ সালের ২৩ থেকে ২৫ নভেম্বরের ঘটনা। দিনাজপুর জেলা ও ফুলবাড়িসহ ৬ থানায় এশিয়া এনার্জি যাতে নির্বিঘ্নে ‘জরিপ কাজ’ চালাতে পারে সে জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা সার্কুলারের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলেন ফুলবাড়ির জনগণ। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল-সমাবেশ-হরতাল পালনের মধ্যে দিয়ে তারা সার্কুলার প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেন প্রশাসনকে। হাজারো মানুষের দিনভর লাঠিসোঁটা নিয়ে টহল, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কারণে ২৯ জানুয়ারি, ২০১৩ দিনাজপুরের কয়লাখনি এলাকা পরিদর্শন করতে পারেননি বহুজাতিক এশিয়া এনার্জির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর গ্যারি এন লাই।

ফলে এমন একটা পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যে, এশিয়া এনার্জি ও তার এজেন্টরা সরাসরি ফুলবাড়িতে কোনো কিছু করা আর সম্ভব নয় এটা বুঝতে পেরে কখনও বিরামপুর বা পার্বতীপুর, আবার কখনও বড়পুকুরিয়া টার্গেট করছে। সম্প্রতি এশিয়া এনার্জি ও তার এদেশীয় দোসরদের তৎপরতার একটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বড়পুকুরিয়া। সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত খননের কথা বলে চলেছেন, ভাড়াটে বিশেষজ্ঞ পত্রিকায় কলাম লিখছেন, ভাড়াটে সাংবাদিক ছাপাচ্ছেন মিথ্যা ও ভুল তথ্যে ভরা সংবাদ। এদের অপতৎপরতা প্রতিরোধের ডাক দিয়ে পালিত হচ্ছে এবারের ফুলবাড়ি দিবস। ‘ফুলবাড়ি দিবস ২০১৪’ হুঁশিয়ারি জানাচ্ছে ‘শহীদের খুনে রাঙা পথে কোনো দালাল ও বেঈমানের স্থান নেই’।

৩. ১০ জুলাই জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু সংবাদ মাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উত্তরাংশ থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু হবে। পানি ব্যবস্থাপনার একটি মডেল তৈরির কাজ করছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ইন্সটিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)। ‘হাইড্রোলজিক্যাল স্টাডি অ্যান্ড গ্রাইন্ড ওয়াটার মডেলিং ফর নর্দান পার্ট অব বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং’ শীর্ষক এই সমীক্ষা প্রকল্প শেষ হবে সেপ্টেম্বরে। তখন রিপোর্ট পাওয়া গেলেই নাকি উন্মুক্ত খননের কাজ শুরু হবে।

এরপর ২০ জুলাই মুশফিকুর রহমান নামের এক খনি প্রকৌশলী যিনি দীর্ঘদিন ধরেই উন্মুক্ত কয়লা খননের পক্ষে লেখালেখি করছেন, তিনিও প্রথম আলোয় প্রকাশিত লেখায় ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) চলতি সমীক্ষার প্রসঙ্গ টেনে বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত কয়লা খননের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘‘উন্মুক্ত কয়লা খনি নির্মাণের প্রয়োজনে বড়পুকুরিয়ার সংশ্লিষ্ট অংশ থেকে বছরে প্রায় ৩৪৪ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি উত্তোলন করতে হবে এবং আইডব্লিউএম সেখানে ডিওয়াটারিং অপারেশন ব্যবস্থাপনা সম্ভব বলে মনে করে।’’

এসবই হল আইডব্লিউএম-এর স্টাডি কাজে লাগিয়ে, এমনকি কথিত স্টাডি সমাপ্ত হওয়ার আগেই উন্মুক্ত খননের পক্ষে জনমত তৈরির সাম্প্রতিক তৎপরতার অংশ। বোঝাই যাচ্ছে, আইডব্লিউএম-এর স্টাডি প্রকাশিত হলে এর দোহাই দিয়ে বলে দেওয়া হবে যে, উন্মুক্ত খননের ফলে সম্ভাব্য পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে; ফলে উন্মুক্ত কয়লা খননে আর কোনো সমস্যা হবে না!

পানি উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনার কারিগরি সমস্যাই বড়পুকুরিয়া কিংবা ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আসল কিংবা একমাত্র সমস্যা কিনা সে বিষয়ে কিছু কথা বলে রাখা তাই জরুরি হয়ে পড়েছে।

নিশ্চিতভাবেই ডিওয়াটারিং অপারেশন ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশে উন্মুক্ত কয়লা খননের একটা বড় সমস্যা। বড়পুকুরিয়া ফুলবাড়ির কয়লা স্তরের উপরে ৮০ থেকে ১২০ মিটার পুরু ধূপিটিলা পানির স্তর। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে হলে কয়লার উপরের স্তর পানিশূন্য করতে হবে। আর কয়লার ঠিক উপরের স্তর পানিশূন্য করতে হলে আশপাশের পানি পাম্পের মাধ্যমে সরিয়ে পানির স্তর কয়লার স্তরের নিচে নামিয়ে ফেলতে হবে।

এখন হেভি ডিউটি পাম্পের মাধ্যমে কয়লা স্তরের উপরের ধূপিটিলা স্তর পানিশূন্য করা যাবে কিনা, পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন শুরু করলে আদৌ এলাকাটি পানিশূন্য হবে কিনা, নাকি পাম্পের টানে চারপাশ থেকে খনি এলাকায় পানি প্রবাহের হার আরও বেড়ে যাবে কিংবা বর্ষাকালে শুকনো অবস্থা কীভাবে বজায় রাখা যাবে– এসব কারিগরি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া খুবই জরুরি।

এই প্রশ্নগুলো সরকারের মোশাররফ কমিটির রিপোর্টেও জোরেশোরে উত্থাপন করা হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং যে জরিপের কথা মন্ত্রী আমাদের শুনিয়েছেন তার মাধ্যমে হয়তো এসব প্রশ্নের একটা উত্তর পাওয়া যাবে। যদিও সরকার উন্মুক্ত খনন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে থাকলে সরকারি প্রতিষ্ঠান কতটা নিরপেক্ষভাবে জটিলতাগুলো হাজির করতে পারবে সেটা প্রশ্ন। নাকি তারা একান্ত বাধ্যগতভাবে দায়সারা গোছের পানি ব্যবস্থাপনা সম্ভব বলে একটা রায় দিয়ে দেবে– সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

কিন্তু ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং ডিওয়াটারিং অপারেশন ব্যবস্থাপনা সম্ভব বা বছরে ৩৪৪ ঘনমিটার হারে পানি উত্তোলন কারিগরিভাবে সম্ভব বলে রায় দিয়ে দিলেই তো সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কারিগরিভাবে ডিওয়াটিরিং বা পানিশূন্য করা যাবে কি যাবে না কিংবা ডিওয়াটিরিং করার পর শুকনো অবস্থাটা ধরে রাখা যাবে কিনা এটা হল পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সমস্যার একটা দিক, কিন্তু তার চেয়ে বড় সমস্যা ডিওয়াটিরিং করার পরবর্তী পরিবেশ বিপর্যয়।

কয়লার স্তর পানিশূন্য করতে হলে কয়লা স্তরের আশপাশের একটা বিশাল এলাকা পানিশূন্য করতে হবে, চারপাশের পানির স্তর কয়লা স্তরের নিচে নামিয়ে আনতে হবে। একটা বিশাল এলাকা জুড়ে ধূপিটিলা স্তর পানিশূন্য করা হলে কৃষিকাজ, খাওয়ার পানি ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহারের পানি পাওয়া যাবে না। গোটা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। এক কথায় শুকনো মরুতে পরিণত হবে গোটা এলাকা।

উত্তোলিত পানিতে নানান দূষিত পদার্থ থাকার কারণে এই পানি ভূ-পৃষ্ঠের উপর দিয়ে প্রবাহিত করা হলে তারও একটা ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে চারপাশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর। দূষিত পানি যেখানে প্রবাহিত করা হবে, সেখানকার পরিবেশও দূষিত হবে। কোনো সমীক্ষা বা জরিপের মাধ্যমেই তো এই সমস্যার সমাধানের উপায় বের করা সম্ভব নয়। কারণ কয়লা তুলতে গেলে মরুকরণ করতেই হবে। আর মরুকরণ হবে কিন্ত কোনো রকম ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না, এটা বিশ্বাস করার কারণ নেই!

সবচেয়ে বড় কথা, পানি ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশে উন্মু্ক্ত কয়লা খননের একমাত্র সমস্যা নয়। যে কোনো একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান পানি ব্যবস্থাপনা সম্ভব রায় দিলেই বড়পুকুরিয়া বা ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত কয়লা খনন গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে। মরুকরণ ছাড়াও উন্মুক্ত কয়লা খননের ফলে মারাত্মক যেসব সমস্যা হবে সেগুলো হল–

প্রথমত, উন্মুক্ত কয়লা খনি করা হলে কয়লা স্তরের উপর এবং তার আশপাশের এলাকার জনবসতি ধ্বংস হবে।

দ্বিতীয়ত, এর ফলে খনি এলাকার ও আশপাশের কৃষিজমি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।

তৃতীয়ত, বহু কর্মসংস্থান ধ্বংস হবে। বিনিময়ে কয়লা খনিতে কর্মসংস্থান হবে খুব সামান্য।

চতুর্থত, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন করতে হলে কয়লার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি মাটি (ওভার বারডেন) কয়লার উপরের স্তর থেকে উত্তোলন করতে হবে। উত্তোলিত মাটিতে থাকা বিভিন্ন বিষাক্ত খনিজ পদার্থ বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে আশপাশের পানি দূষিত করে, এসিড মাইন ড্রেনেজের সৃষ্টি করে।

৪. এ সকল সম্ভাব্য বিপর্যয়ের চিত্র বহুবার বহু বিশেষজ্ঞ তাদের লেখায় বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ তুলে ধরেছেন। সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে গঠিত নূরুল ইসলাম কমিটি, পাটোয়ারি কমিটি এবং সাম্প্রতিককালের মোশারফ কমিটি– সবার রিপোর্টেই এই পানি-মাটি-কৃষি-কর্মসংস্থান-পরিবেশের বিপর্যয়ের দিকগুলো উঠে এসেছে। বিপর্যয়ের চিত্র এত স্পষ্ট হওয়ার পরও শাসক গোষ্ঠীর কাছে কোম্পানির স্বার্থ, কমিশন ও মুনাফার ধান্দা প্রাধান্য পায় বলেই একেকবার একেক ছুতায় উন্মুক্ত খননের তৎপরতা চলে; জনসচেতনতা ও জনপ্রতিরোধের মুখে যা আবার দ্রুতই মিলিয়ে যায়।

শুধু ফুলবাড়ি বা বড়পুকুরিয়া নয়, গোটা উত্তরবঙ্গের জন্য বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এই উন্মুক্ত কয়লা খননের সকল তৎপরতার চিরস্থায়ী অবসান বাংলাদেশের নিরাপদ অস্তিত্বের জন্য ভীষণ জরুরি। সেই সঙ্গে জরুরি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের কয়লা সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য জাতীয় সক্ষমতা তৈরির যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ।

বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে ফুলবাড়ি ও বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত খননের জন্য যত তোড়জোড় প্রায় এক দশক ধরে চলছে, তার একটা ভগ্নাংশও যদি দীঘিপাড়া-খালাশপীর-জামালগঞ্জের কয়লা, যা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে তোলা একেবারেই অসম্ভব, তার সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কারিগরি-অর্থনৈতিক-পরিবেশগত সমীক্ষা চালানোর দিকে নিয়োজিত হত, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক জ্বালানির যে সংকট এতদিন ধরে জিইয়ে রাখা হয়েছে, তার হয়তো একটা সমাধান হয়ে যেত।