Sunday, July 20th, 2014

মতবিনিময় সভা: ‘সমুদ্র সম্পদ উত্তোলনে জনস্বার্থকেন্দ্রিক নীতি গ্রহণ করতে হবে, সুন্দরবন বা উত্তরবঙ্গ ধ্বংসী প্রকল্প বাতিল করতে হবে’

তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি আয়োজিত ‘সমুদ্র সম্পদ, বড়পুকুরিয়া ও সুন্দরবন : জাতীয় স্বার্থ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, সমুদ্র সম্পদ-গ্যাস-কয়লা-সুন্দরবন অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবহার করতে জনস্বার্থের পক্ষে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকার কমিশনভোগী ও দুর্নীতিবাজদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় দেশি বিদেশি লুটেরাদের স্বার্থে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সমুদ্র সম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ভারতের লবিষ্টদের তৎপরতা আরও ভয়াবহ পথে অগ্রসর হচ্ছে। সেক্ষত্রে জনগণকেই তদারকি ও পাহারাদারের দায়িত্ব নিতে হবে।

১৯ জুলাই ২০১৪ সকাল ১১টায় পুরানা পল্টনস্থ মুক্তিভবনের প্রগতি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ মতবিনিময় সভার সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য রাখেন সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সমুদ্র বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রমজুল হক, প্রাণী বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবুল বাশার, জ্বালানী বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী বিডি রহমতউল্লাহ, গবেষক অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান, অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা, প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফা ও রাজনীতিক রুহিন হোসেন প্রিন্স। রাজনীতিক বজলুর রশীদ ফিরোজ, অ্যাড. আব্দুস সালাম, আব্দুস সাত্তার, জাহাঙ্গীর আলম ফজলু, আবু তাহের, মাসুদ খান প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, সমুদ্র সীমা নিষ্পত্তি হয়েছে। এখন এই সম্পদের ওপর জাতীয় মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প নানাভাবে আঘাতপ্রাপ্ত সুন্দরবনের ওপর মরণ আঘাত নিয়ে আসছে। তিনি সমুদ্র সম্পদ-বড়পুকুরিয়া-সন্দুরবন রক্ষায় জাতীয় কমিটির কর্মসূচি সফল করতে সচেতন দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, গ্যাসসহ সমুদ্র ও স্থলভাগের সব সম্পদ মানুষের স্বার্থে ব্যবহার করতে বর্তমান নীতি ও চুক্তির ধরনের আমূল পরিবর্তন দরকার। তিনি বলেন, নানা বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র ভিন্নমত থাকলেও সমুদ্রের গ্যাস-তেল ব্লক বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে ঐক্যমত রয়েছে। সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর তা দ্রুত বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেবার জন্য অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। অথচ প্রয়োজন বিশাল সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে প্রতিষ্ঠানসহ জাতীয় সক্ষমতার বিকাশে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ।

তিনি ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণবাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ২০০৬ সালে এই চুক্তির পক্ষে তার অবস্থান ঘোষণা করেছিলেন। এই চুক্তির মূল কথা হলো উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধ এবং এশিয়া এনার্জি দেশ থেকে বহিষ্কার করা। অথচ বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার জনস্বার্থবিরোধী আয়োজন করা হচ্ছে। এশিয়া এনার্জি দেশবিরোধী চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগেও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে মাটি, পানি ও মানুষের ধ্বংসযজ্ঞের কথা বলে নতুন প্রযুক্তির জন্য অপেকখা করবার কথা বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কথা ও সরকারের কাজের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য নিয়ে আনু মুহাম্মদ প্রশ্ন তুলে বলেন উত্তরবঙ্গ ধ্বংসের কোন প্রকল্প জনগণ গ্রহণ করবে না। সমুদ্রসম্পদ নিয়ে যথাযথ পরিকল্পনা নিলে বড়পুকুরিয়া ও সুন্দরবনে দেশবিধ্বংসী বিদ্যুতের কোন যুক্তি থাকে না।

অধ্যাপক রমজুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক যত নীতিমালা আছে তাতে পরিবেশ রক্ষার কথা বলা আছে। তাই পরিবেশ প্রকৃতি ঠিক রেখে সমুদ্রের সম্পদ আহরণ করতে হবে। তার আগে সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

অধ্যাপক আবুল বাশার বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র বায়বীয় পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখে। একদিকে সুন্দরবন ধ্বংসের আয়োজন করা হচ্ছে অন্যদিকে সুন্দরবন রক্ষায় ২৫০ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। এর কোন দরকার নেই। মানুষ ক্ষতি না করলে সুন্দরবন ধ্বংস হবে না। প্রকৌশলী বিডি রহমতউল্লাহ বলেন, সমুদ্রসীমায় আমাদের পরাজয় হয়েছে। লুন্ঠন ও দুর্নীতির জন্য সম্পদ ব্যবহার যথাযথ হচ্ছে না। কয়লা বিদ্যুৎ করে সর্বনাশের কোন দরকার নেই, বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমাদের যথেষ্ট নবায়নযোগ্য সম্পদ আছে। পানি-বায়ু-সূর্যকে ব্যবহার করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এখান থেকেই বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান সম্ভব হবে।

ড. তানজিমউদ্দিন খান বলেন, সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। এখানকার গাছ মাটি পর্যন্ত কার্বন শোষণ করে। সেই সুন্দরবন এলাকায় তাপ বিদ্যুৎ প্রকল্প করার কুযুক্তি দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।

অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের পক্ষে সরকার একতরফা প্রচার করছে। ঐ আঞ্চলের মানুষ ও বিশেষজ্ঞদের কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। এটা গণতন্ত্রের নমুনা হতে পারে না।

প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফা বলেন, বড়পুকুরিয়ায় এখন মাত্র ১০০ থেকে ১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলছে। তার ফ্লাই অ্যাশ পুকুরে ফেলা হচ্ছে। পুকুর থেকে উপচে পড়া পানি পাশের নদীতে যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষ ঐ নদীর পানিকে বলে কেরসিন পানি। এর চাইতে ১০ গুণ বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র করে সুন্দরবন ধ্বংস জনগণ মানতে পারে না।

রুহিন হোসেন প্রিন্স সমুদ্রের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান দেশিয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স এর মাধ্যমে করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সম্পদের উপর জনগণের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সুন্দরবন এলাকায় ওরিয়ন গ্রুপকে যে বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমতি দেওয়া হলো তার কোনো রিপোর্ট দেশবাসী জানে না।

মতবিনিময় সভায় সুন্দরবন রক্ষাসহ জাতীয় কমিটির ৭ দফা দাবিতে আগামী ১১ আগস্ট খুলনায় আঞ্চলিক কনভেনশন, ১৮-২০ আগস্ট খুলনা বাগেরহাট অঞ্চলে সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা, ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ি দিবস ও ১৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় কনভেনশন সফল করতে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।