Monday, June 23rd, 2014

‘দেশ , মানুষ ও সম্পদ রক্ষায় ফুলবাড়ী আন্দোলনের চেতনা ক্রমে আরও শক্তিশালী হবে’

গত ২১ জুন ২০১৪ দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলায় তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি, ফুলবাড়ী শাখার আয়োজনে এক মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ  ‘ভারতের উন্মুক্ত খনি ও কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র: পরিদর্শন অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে উন্মুক্ত কয়লা খননের ভারতীয় অভিজ্ঞতার তথ্য উপস্থাপন করেন এবং তার আলোকে ফুলবাড়ী র  মানুষ এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত কয়লা প্রকল্প  বিরোধী আন্দোলনের  মাধ্যমে দেশকে কী ভয়ংকর পরিণতির হাত থেকে রক্ষা করেছেন তা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। সভার শুরুতেই গত অক্টেবর ২০১৩ তারিখে বাংলাদেশ থেকে আট সদস্যের প্রতিনিধি দলের ভারতীয় উন্মুক্ত খনি ও কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকা পরিদর্শন অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে নির্মিত প্রামাণ্য চিত্র ‘ফুলবাড়ী দেবো না’ প্রদর্শিত হয়। সভায়  আরও বক্তব্য রাখেন ফুলবাড়ী আন্দোলন বিষয়ক গবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা নিৎত্রা। প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফা ‘এশিয়া এনার্জির(জিসিএম) প্রকল্প কিভাবে ফুলবাড়ী-বিরামপুর-পার্বতীপুর সহ উত্তরবঙ্গ ধ্বংস করবে?’ শীর্ষক পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টাশান উপস্থাপন করেন। সভায় সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ফুলবাড়ী আন্দোলনের করণীয় নিয়ে বক্তব্য রাখেন জাতীয় কমিটির দিনাজপুর শাখার আহবায়ক আলতাফ হোসেন । সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহবায়ক সাইফুল ইসলাম জুয়েল।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তার উপস্থাপনায় ভারতের ঝাড়খন্ডের ঝরিয়া ও হাজারীবাগ, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশের সিংগ্রলি ও শক্তিনগরে বিভিন্ন উন্মুক্ত কয়লা খনি ও কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকা পরিদর্শন,  এসব এলাকা থেকে উচ্ছেদকৃত মানুষ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের সংগঠকদের সাথে আলোচনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।  বিভিন্ন ছবির মাধ্যমে তিনি একে একে তুলে ধরেন ভারতের উন্মুক্ত কয়লা খনিগুলোর ধ্বংসযজ্ঞের কথা, খনি থেকে উচ্ছেদকৃত কৃষকদের কথা, জীবিকার সকল উৎস হারিয়ে যারা এখন  ‘কয়লা চোর’ নামে পরিচিত। তার উপস্থাপনা থেকে দেখা যায় খনি থেকে দূষিত পানি এসে পড়ছে বোকারো নদীতে, বৃষ্টিতে খনির বর্জ্য (ওভার বার্ডেন) থেকে পানি এসে নষ্ট হয়ে গেছে এলাকার একমাত্র কুয়া। পানের পানি আনতে যেতে হয় বহুদূর।

উন্মুক্ত কয়লা প্রকল্পের শুরুতে স্থানীয় জনগণকে উন্নত আবাস, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কাজের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিলো। বাস্তবে সে প্রতিশ্রুতি যে রাখা হয়নি সে বিষয়টিও ছবিসহ বিস্তারিত উঠে আসে। ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে বারবার উচ্ছেদ করা হয়েছে। যেখানে সামান্য কিছু মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছে সেটাও অস্বাস্থ্যকর, ঝুঁকিপূর্ণ। চারিদিকে খাবার ও ব্যবহার যোগ্য পানির তীব্র সংকট। খনির বিস্ফোরণে পুনবাসন এলাকার ঘর বাড়িও রক্ষা পায়না। তাদের জমি গেছে। আবাদ হয় না। কাজও গেছে। অসুস্থতা চিরস্থায়ী। জন্মগতভাবে পঙ্গু হচ্ছে অনেক শিশু।

ভারত উন্মুক্ত কয়লা খননের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন ভারতে বাংলাদেশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম জনবসতি, পাথুরে মাটি, সীমিত পানি সম্পদ থাকার পরেও, এমনকি ভারতের নিজস্ব সরকারি বেসরকারি কোম্পানি দিয়ে উন্মুক্ত খনন করার পরেও যে ভয়াবহ ধ্বংস যজ্ঞ ঘটেছে তাতে বাংলাদেশের উর্বর, নরম মাটি , পানি সম্পদ, কৃষি ও জীব বৈচিত্রে সমৃদ্ধ ফুলবাড়ী র মতো জনপদে এশিয়া এনার্জির  মতো বহুজাতিক কোম্পানির মাধ্যমে উন্মুক্ত কয়লা খনি করলে  তার ভয়াবহতা চিন্তা করাও কঠিন।

সামিনা লুৎফা নিৎত্রা বলেন, ফুলবাড়ীর জনগণ যেভাবে প্রায় এক দশক ধরে বহুজাতিক এশিয়া এনার্জির তৎপরতার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে তার সারা দুনিয়ায় মানুষ ও প্রকৃতি ধ্বংসী বহুজাতিক পুজির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। উন্মুক্ত কয়লা খনির ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে ফুলবাড়ীর জনগণ শুধু যে তাদের ভিটা মাটি কিংবা কৃষি জমিই রক্ষা করছেন তা নয়, রক্ষা করছেন উত্তরবঙ্গ সহ গোটা বাংলাদেশকেই। তিনি ফুলবাড়ী বাসীকে ধন্যবাদ  ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন দেশ , মানুষ ও সম্পদ রক্ষার ফুলবাড়ী আন্দোলনের চেতনা ক্রমে আরও শক্তিশালী হবে।

প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফা তার উপস্থাপনায় ফুলবাড়িতে উন্মুক্ত কয়লা খনি করা হলে তা কেমন করে ফুলবাড়ি সহ বিরামপুর, নবাবপুর, পাবর্তীপুর সহ গোটা উত্তরবঙ্গে বিপর্যয় ডেকে আনবে, কিভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ উচ্ছেদ হবে, আবাদি জমি নষ্ট সহ মাটির উপরের ও নীচের পানি  সম্পদ ও জীব বৈচিত্র ধ্বংস হবে সে বিষয়ে ম্যাপের মাধ্যমে বিস্তারিত যুক্তি, তথ্য ও ছবি তুলে ধরেন।

সভায় মাদকসেবী সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের নিয়ে এশিয়া এনার্জির সাম্প্রতিক অপতৎপরতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে হুশিয়ারী  উচ্চারণ করে অবিলম্বে এশিয়া এনার্জি বহিষ্কারসহ ৬ দফা ফুলবাড়ী চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানানো হয়।  বলা হয়, আগামী ২৬ আগষ্ট দেশব্যাপী ‘ফুলবাড়ী দিবস’ পালনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের আরও নতুন কমসূচি ঘোষণা করা হবে।