Monday, June 16th, 2014

প্রধানমন্ত্রীর ভুল তথ্য ও ভুল যুক্তি প্রসঙ্গে জাতীয় কমিটির বক্তব্য

তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর শেষে ঢাকায় ফিরে গত ১৪ জুন অন্যান্য বিষয়ের সাথে সুন্দরবন ধ্বংসী রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বিষয়ে কিছু কথা বলেছেন। এসব কথার মধ্যে বেশ কিছু গুরুতর ভুল তথ্য ও যুক্তি আছে। এগুলো জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে বিধায় তাঁর এবং দেশবাসীর কাছে সঠিক তথ্য এবং যুক্তি তুলে ধরা আমরা প্রয়োজন মনে করছি।

প্রথমত: প্রধানমন্ত্রী বলেছেন রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পবিরোধী আন্দোলনকারীরা ‘না জেনে এবং সেখানে না গিয়েই আন্দোলন করছে’। তার এই কথার মধ্যে সত্যের লেশমাত্র নাই। জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে আমরা ২০১০ সাল থেকেই ঐ অঞ্চলে যাচ্ছি। সেই বছর স্থানীয় মানুষেরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের হুমকির মুখে ‘কৃষি জমি রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে। তাঁদের কাছেই আমরা জানতে পারি পরিবেশ সমীক্ষা না করে জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে এবং পুলিশ ও সন্ত্রাসী দিয়ে নির্যাতন করে মানুষদের তাদের জমি ও বসতি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর আমন্ত্রণেই আমরা তখন প্রকৃত পরিস্থিতি অনুসন্ধানের জন্য পশুর নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে যাই। কিন্তু অন্যায়কাজে লিপ্ত লোকজন ভীতসন্ত্রস্থ হয়ে পড়ে। এবং প্রথমে সরকারি দলের সন্ত্রাসী দিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়। দ্বিতীয়বার পুলিশী প্রতিবন্ধকতার মাধ্যমে আমাদের তথ্য অনুসন্ধানে বাধা দেয়া হয়। এর আগে পরে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা কয়েকবছর ধরে সুন্দরবনের উপর কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন। এইসব গবেষণা এবং ভারতসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা, আইন পর্যালোচনা করে আমরা নিশ্চিত হই যে, সুন্দরবনের যে দূরত্বে এ বিদ্যুৎ প্রকল্প করা হচ্ছে তাতে এর ধ্বংস অনিবার্য। কয়েক বছর ধরে একদিকে যুক্তি তথ্য ও গবেষণা এবং অন্য দিকে সুন্দরবন রক্ষায় মানুষের তাগিদের ফলে সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের অংশগ্রহণে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা-সুন্দরবন অভিমুখে একটি লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়। যাতে সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট অঞ্চলসহ দেশের লক্ষাধিক মানুষ নানাভাবে অংশ নেন।

কিন্তু সরকার যাচ্ছে উল্টোপথে। ভারতীয় কোম্পানির পর দেশের বহু দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত ওরিয়ন গ্র“পকে আরেকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে সুযোগ দেয়া হচ্ছে। ভূমিদস্যুদের আগ্রাসী তৎপরতা বেড়েছে। আশার কথা এই যে, মুনাফালোভী ভারতের এনটিপিসি ও বাংলাদেশের ওরিয়ন কোম্পানি, চীনাসহ কতিপয় কনসালট্যান্ট, ভূমিদস্যু এবং কমিশনভোগী ছাড়া বাংলাদেশের সকল মানুষ সুন্দরবনধ্বংসী এসব তৎপরতার বিরুদ্ধে।

দ্বিতীয়ত: প্রধানমন্ত্রী বলেছেন বড়পুকুরিয়ায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ফলে পরিবেশের কোন ক্ষতি হয়নি রামপালেও হবে না। এই বক্তব্যেও সত্যতা নেই। বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সাথের কয়লা খনি আকারে অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও ইতিমধ্যে সংশি¬ষ্ট অঞ্চলে পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিভিন্নমাত্রিক। ভূগর্ভস্ত পানির স্তর নেমে গিয়ে কৃষি ও পানের পানির সংকট দেখা দিয়েছে, এলাকার খালবিলের পানি বিষাক্ত হয়েছে, বায়ু দূষণে এলাকাবাসীর স্বাস্থ্যহুমকি সৃষ্টি হয়েছে এবং আবাদী জমির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইতিমধ্যে গ্রাম উজাড় হয়েছে এবং সরকার তাদের দাবির মুখে ক্ষতিপূরণে শতাধিক কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। এসব ক্ষয়ক্ষতি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে মানুষকে এলাকা থেকে সরিয়ে আরও ভয়াবহ উন্মুক্ত খনির চক্রান্ত চলছে। জনস্বার্থেই যদি সরকার কাজ করে তাহলে অস্বচ্ছতা, চক্রান্ত, বলপ্রয়োগ কেন?

প্রকৃত পক্ষে ক্ষতির মাত্রার দিক থেকে বড়পুকুরিয়ার সাথে রামপালের কোন তুলনা হয় না। বড়পুকুরিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ১৫০ মেগাওয়াট। রামপালে পরিকল্পনা হলো, প্রথমে ১৩২০ মেগাওয়াট ও পরে ক্রমান্বয়ে সবমিলে প্রায় ৩০০০ মেগাওয়াট, ২০ গুণ বেশি। বড়পুকুরিয়ায় নদী দিয়ে কয়লা আনতে হয় না। রামপালে পশুরনদীর দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আনতে হবে। সর্বোপরি বড়পুকুরিয়ায় কোন সুন্দরবন নাই কিন্তু রামপালে সুন্দরবনের বিপদজনক সীমার মধ্যেই এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। সুতরাং রামপালে ক্ষতি তুলনায় বহু বহু গুণ বেশি, এবং এসব ক্ষতিপূরণযোগ্য নয়।

সুন্দরবন রক্ষা মানে নিছক কিছু গাছপালা, পশু-পাখি রক্ষা নয় এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন জীবিকার উৎস। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচায়। সুন্দরবন না থাকলে বাংলাদেশ অরক্ষিত হয়ে পড়বে। আমরা তাই বারবার বলি বিদ্যুতের অনেক বিকল্প আছে, সুন্দরবনের কোন বিকল্প নেই। সুন্দরবন একটাই, ধ্বংস হলে আর কখনো পাওয়া যাবে না।

আমরা এখনও আশাকরি প্রধানমন্ত্রী তাঁর তথ্য ও যুক্তির ভ্রান্তি বুঝতে পারবেন এবং সুন্দরবন ধ্বংসী সব তৎপরতা বন্ধ করে সুন্দরবন বিকাশে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবেন। সাথে সাথে অন্য নিরাপদ স্থানে স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিবেশ সমীক্ষা যথাযথভাবে সম্পন্ন করে জনসম্মতির ভিত্তিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে উদ্যোগ নেবেন। আর দেশের সকল মানুষ, কৃষি ও শিল্পে কমদামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের টেকসই ব্যবস্থা করতে জাতীয় কমিটির ৭ দফা বাস্তবায়ন করবেন।