Monday, May 26th, 2014

পিকো হাইড্রোঃ জ্বালানীর নবায়নযোগ্যতায় অভিনব সংযোজন

বর্তমান জ্বালানী সংকট কোন দেশ বা অঞ্চল বিশেষের সমস্যা নয়। বরং পৃথিবীব্যাপী জীবাশ্ন জ্বালানীর নিয়ত কমতে থাকা রিজার্ভ, আমদানীর উচ্চব্যয় আর পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাবের কারণে জ্বালানী সংকট আজ বিশ্বব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করেছে। তবে এই সংকট সমাধানের উপায়ও চলে এসেছে আমাদের হাতের নাগালে। নবায়নযোগ্য জ্বালানী ইতোমধ্যেই এই সংকট মহামারীর কার্যকর প্রতিষেধকে পরিণত হয়েছে। দেশে দেশে চলছে নবায়নযোগ্য জ্বালানী কেন্দ্রিক ব্যাপক কর্মযজ্জ আর প্রযুক্তিকে সুলভ করতে চলছে নানান রকম উদ্ভাবন। ঠিক এ ধরণের এক সদ্য উদ্ভাবিত প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হতেই আমি অংশগ্রহণ করি শ্রীলংকায় আয়োজিত পিকো হাইড্রো কংক্রীট টারবাইন টেকনোলজির উপর মাসব্যাপী এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায়। জানতে পারি এর খুঁটিনাটি দিক সম্পর্কে।

পিকো হাইড্রোঃ

এটি খুবই ছোট আকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন মাধ্যম। এর উৎপাদন ক্ষমতা ১০০ ওয়াট থেকে ১কিলোওয়াট পর্যন্ত হতে পারে। এতে কোন বাঁধ তৈরীর দরকার হয় না বলে তা সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। আর ছোট আকারের প্রকল্প হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে তুলনামূলক সাশ্রয়ী উপায়ে বিদ্যুতের সংস্থান করা সম্ভব।

ছবিঃ পিকো হাইড্রো প্রকল্প

পিকো হাইড্রো প্রযুক্তিতে পানির উৎস হতে পারে কোন ঝরণা, নদীর ধারা বা সেচ খাল। পানির উৎসের উচ্চতা কমপক্ষে ২ মিটার হওয়া আবশ্যক। আর প্রতি সেকেন্ডে প্রবাহ হতে পারে ৫ লিটার থেকে ৫০ লিটার পর্যন্ত। এর কর্মদক্ষতা প্রায় শতকরা ৪০ ভাগ।

এত কম বিদ্যুৎ!! :

শহুরে জীবনে বিদ্যুতের ব্যবহার মানেই বড় বড় কলকারখানা চালানো কিংবা ঘরের কোণের এয়ারকুলার বা বিপণিবিতানের তীব্র আলোর ঝলকানি। কিন্তু যে মানুষগুলোর কাছে রাত মানে শুধুই অন্ধকার আর শিক্ষা, চিকিৎসা সহ সকল সুবিধা বঞ্চিত জীবন নিয়ে কর্মহীন নিদ্রা যাপন, তাদের ঘরে একটি বৈদ্যুতিক বাতি একটি আলাদিনের চেরাগ হাতে পাবার মতই জাদুকরী।

একক মালিকানায় বা সামষ্টিকভাবে সমবায়ের ভিত্তিতে পিকো হাইড্রো প্রকল্পগুলো চলছে। একক মালিকানায় চলা প্রকল্পগুলোর একটি ছিল আবিসিরির পিকো হাইড্রো প্রকল্প। উনি তাঁর বাড়ির পাশে বয়ে চলা ঝরণার পানি থেকে ১ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছেন। আর সেই বিদ্যুৎ দিয়ে উনার পাঁচ সদস্যের পরিবারে বৈদ্যুতিক পাখা, বাতি, রাইস কুকার, ইস্ত্রি এমনকি ওয়াশিং মেশিন পর্যন্ত ব্যবহার করছেন। বড় লোড যেমন ইস্ত্রি কিংবা ওয়াশিং মেশিন ব্যবহারের সময় কিছুক্ষণের জন্য তিনি অন্য লোডগুলোর ব্যবহার বন্ধ রাখেন। বড় লোড ব্যবহার শেষে আবার অন্য লোডগুলো চালু করেন।

অন্যদিকে সমবায়ের ভিত্তিতে চলা প্রকল্পগুলো রাতে সব পরিবারে বাতি আর বৈদ্যুতিক পাখার সুবিধা দিচ্ছে আর দিনে যখন সবাই বাড়ির বাইরে কাজে বেরিয়ে পড়ে তখন উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে চাল বা গম ভাঙ্গানোর কাজে বা হালকা শিল্পোৎপাদনে, স্কুল এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে। এভাবেই পিকো হাইড্রো প্রযুক্তির স্বল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সমাজে নিয়ে আসছে ব্যাপক পরিবর্তন। শিক্ষা, চিকিৎসা আর যোগাযোগ ব্যবস্থায় পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে এগিয়ে নিচ্ছে বহুদূর।

প্রযুক্তির স্থানীয়করণঃ

বর্তমান যুগে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিয়ে কোন সমস্যা না থাকলেও এর সুলভ প্রাপ্তি বরাবরের মতই এক দুশ্চিন্তার কারণ। আমদানীকৃত চড়া দামের প্রযুক্তি কীভাবে স্থানীয়করণের (Technology Adaptation) মাধ্যমে সুলভ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায় তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শ্রীলঙ্কা।

সাধারণত পিকো হাইড্রো টেকনোলজির টারবাইন ধারকটি তৈরী হয় স্টীল দিয়ে, টারবাইন রানার তৈরী হয় কাস্ট আয়রণ আর রানার বাকেট তৈরী হয় ব্রাস দিয়ে। স্টীল, কাস্ট আয়রণ আর ব্রাস নানাভাবে পরীক্ষিত হলেও প্রতিটির উচ্চমূল্য সামগ্রিকভাবে পুরো সিস্টেমের দাম বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ। শ্রীলংকাতে এ জিনিসগুলো পরিবর্তিত হয়েছে কংক্রীট, ফাইবার গ্লাস আর অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে। ১:১.৫:২ অনুপাতে সিমেন্ট, বালু আর ছোট পাথর ব্যবহার করে মাত্র আধা বস্তা সিমেন্টেই তৈরী করে ফেলা যায় টারবাইন ক্যাসিং (Turbine Casing) আর জেনারেটর মাউন্টিং (Generator Mounting) যা স্টীলের তুলনায় অনেক সস্তা আর স্থানীয়ভাবে কম খরচে তৈরী যোগ্য। স্থানীয় কারিগর দিয়ে রানার বাকেট তৈরী হচ্ছে অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে আর টারবাইন রানার তৈরী হচ্ছে ফাইবার গ্লাস টেকনোলজি ব্যবহার করে। প্রতিটি উপাদানই স্থানীয় বাজারে বহুল প্রচলিত। তারা এগুলো নিয়ে গবেষণা করেছে, দেশীয় বাজারে যাচাই করেছে, দক্ষ কারিগরদের খুঁজে বের করে তাদের দিয়ে প্রযুক্তি উন্নয়নের কাজ করাচ্ছে আর এর ফলেই বর্তমানে তা অনেক কম দামে মানুষের কাছে পৌছানো সম্ভব হচ্ছে।

ছবিঃ কংক্রীট টারবাইন ক্যসিং এবং জেনারেটর মাউন্টিং

ছবিঃ কংক্রীট টারবাইন ক্যাসিং

ছবিঃ অ্যালুমিনিয়াম রানার বাকেট

ছবিঃ উচ্চমূল্যের কাস্ট আয়রণ ও ব্রাস রানার বাকেট

ছবিঃ তুলনামূলক সস্তা ফাইবার গ্লাস ও অ্যালুমিনিয়াম রানার বাকেট

ছবিঃ স্থানীয় কারিগরেরা তৈরী করছেন অ্যালুমিনিয়াম বাকেট

ছবিঃ রানার তৈরীর কাঠের ছাঁচ

ছবিঃ স্থানীয় কারিগরই তৈরী করছেন কাঠের ছাঁচ

ছবিঃ ফাইবার গ্লাস ব্যবহার করে চলছে রানার প্রস্তুতি

ছবিঃ টারবাইন রানার প্রস্তুতির এক পর্যায়

একজন রত্নসিরির গল্পঃ

রাজধানী কলম্বো থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কাট্টিকান্ডা গ্রাম বিদ্যুৎ সুবিধাহীন এক নিভৃত পল্লী। চারপাশের পাহাড়ী ঢালে চা আর রাবার বাগানের গাঢ় সবুজের ছড়াছড়ি। এই গ্রামেরই একজন রত্নসিরি। পেশায় অটোরিক্সা চালক। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে বাস করেন টিলার মত এক জায়গায়। উনি প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত নন কিন্তু উনার কারিগরী বিদ্যা প্রয়োগের অভিনবত্ব সত্যিই বিস্ময় জাগানিয়া।

প্রায় ১২ বছর আগে কোথা থেকে যেন তিনি জানতে পারেন যে পানির প্রবাহ থেকেও নাকি বিদ্যুৎ তৈরী করা সম্ভব। তখন থেকেই বাড়ির পাশে বয়ে চলা ঝরণার পানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তাঁর মনে শুরু হয় নানা জল্পনা-কল্পনা। কাজের ফাঁকে ঘোরাঘুরি শুরু করেন বাতিল লোহা-লক্করের মার্কেটে, ধরণা দেন নানা জায়গায়, খুঁজতে থাকেন দরকারী জিনিসগুলো। ২ বছরের মাথায় কাঠ দিয়ে তিনি বানিয়ে ফেলেন অভিনব এক টারবাইন। স্টীল শ্যাফট দিয়ে তা যুক্ত করে দেন একটি মটরের সাথে। পানির প্রবাহ কাজে লাগিয়ে অন্ধকার গ্রামে প্রথমবারের মত তাঁর ঘরে জ্বলে ওঠে বিজলী বাতি।

ছবিঃ রত্নসিরির উদ্ভাবিত বিশেষ টারবাইন

প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ের এক পর্যায়ে আমাদের সৌভাগ্য হয় উনার সাথে পরিচিত হবার আর সেই সাথে উনার নিজের তৈরী টারবাইনটি স্বচক্ষে দেখার। রত্নসিরির তৈরী সিস্টেমটি ছিল ১০০ ওয়াট ক্ষমতার। এটি মাত্র ৫% কর্মদক্ষতায় চলছিল। আমাদের অ্যাসাইনমেন্ট ছিল কংক্রীট টারবাইন দিয়ে এটিকে পরিবর্তিত করে এর কর্মদক্ষতা বাড়ানোর। আমরা মাত্র একদিনেই সেটিকে প্রতিস্থাপন করে ফেলি। বর্তমানে সেটি ৪০% কর্মদক্ষতায় ৮০০ ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

ছবিঃ নিজ ঘরে হাসোজ্জ্বল রত্নসিরি

পাড়াগায়ের অতি সাধারণ এক রত্নসিরি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বিদ্যুতের জন্য তাদের আকুতি আর এটি পাবার জন্য নিজেদের উদ্ভাবনী শক্তি। আমাদের গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে আছে এমন হাজারো রত্নসিরি। সামান্য কারিগরী ও আর্থিক সহযোগীতায় তারাও পারে নিজ নিজ ঘরে আপন আলোর সংস্থান করতে।

বাংলাদেশে পিকো হাইড্রোঃ

পিকো কিংবা মাইক্রো হাইড্রো ভিত্তিক পরিবেশবান্ধব জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের এই মাধ্যম কোন দেশেই চট করে জনপ্রিয়তা পায়নি। নেপাল, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া কিংবা ফিলিপাইনে এ বিদ্যুৎ উৎপাদন আজকের এই অনুকরণিয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে চলেছে নিরন্তর গবেষণা আর ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। বাংলাদেশেও মাইক্রো হাইড্রো প্রকল্পের কাজ শুরু হয় আশির দশকের শুরুতেই। এলজিইডি এবং বিপিডিবির যৌথ সমীক্ষায় সিলেট, চট্রগ্রাম, রাঙ্গামাটি সহ বেশ কয়েকটি এলাকায় সুনির্দিষ্টভাবে মাইক্রো হাইড্রো প্রকল্পের জন্য কয়েকটি জায়গা চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে নীতি নির্ধারনী মহলের সদিচ্ছার অভাবে তা আর এগোয় নি। অপরদিকে পিকো হাইড্রো নিয়ে কোন ধরণের অনুসন্ধান কিংবা গবেষণা আজ পর্যন্ত শুরু হয়নি।

বাংলাদেশে মাইক্রো হাইড্রো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে এই লিংকে <http://mowdud.wordpress.com/2014/01/21/বিদ্যুৎ-উৎপাদনে-মাইক্রো/>

যে কোন সংকট আশু সমাধানের ক্ষমতাই মানুষকে জীব জগতে শ্রেষ্ঠত‌্ব প্রদান করেছে। প্রতিটি সংকটই আমাদেরকে সমাধানের সঠিক পথটি চিনে নিতে সাহায্য করে। আর ঠিক এ কারণেই জ্বালানী সংকট র্বতমান কালে দুশ্চিন্তার কোন কারণ নয় বরং নবায়নযোগ্য সম্পদের ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যত পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলতে আমাদের সামনে এক বিশাল সুযোগ। এ জন্য দেশে দেশে শুরু হয়েছে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে গড়ে উঠছে শক্তিশালী নীতি নির্ধারণী অবকাঠামো, আঞ্চলিক পর্যায়ে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে মিনিগ্রীড কিংবা নেট  মিটারিংয় সিস্টেম আর স্থানীয় পর্যায়ে রত্নসিরির মত মানুষেরা সৃষ্টি করে চলেছেন আপন সংকট সমাধানের অভিনব সব উপায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জনপ্রিয় হচ্ছে পিকো হাইড্রোর মত পরিবেশবান্ধব সস্তা প্রযুক্তি।

পরিশিষ্টঃ

বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানী সম্পদের অসীম সম্ভাবনা ধারণ করে আছে। কিন্তু নীতি নির্ধারণী মহলের অদূরদর্শীতা আর কতিপয় কমিশনভোগী আর সনাতনী চিন্তাধারী বিশেষজ্ঞের পুরনো প্রেসক্রিপশনে জ্বালানী সংকট কেবলই বাড়ছে। কুইক সলিউশনের টোটকা নীতির ফলে জনগণের হাজার কোটি টাকা যাচ্ছে কতিপয় ব্যবসায়ী-আমলা-রাজনীতিবিদদের পকেটে। কয়লার আগ্রাসনে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে আমাদের সুন্দরবন। উন্নত বিশ্বের বাতিল নিউক্লিয়ার টেকনোলজি আমদানীর ফলে হুমকিতে পড়তে যাচ্ছে এক বিশাল জনগোষ্টি।

এসব প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার অসচ্ছ ঋণচুক্তিতে কালবিলম্ব হয় না কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানী নীতি অনুসরণ করে এ খাতের বিশেষায়িত সংস্থা (SREDA) গঠনের নীতিগত আনুমোদন পেতে অপেক্ষা করতে হয় দীঘ পাঁচ বছর।

শুধুমাত্র পিকো-মাইক্রো হাইড্রো, শুধুমাত্র সোলার কিংবা শুধুমাত্র বায়োগ্যাস এককভাবে সংকটের সমাধান করবে না। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক গবেষণা অনুসন্ধান, প্রযুক্তির দেশীয়করণ আর জনগণের মাঝে জনপ্রিয় করতে সঠিক কর্মপন্থা অবলম্বন। যত দ্রুত এই সংকটবোধ আমাদেরকে নবায়নযোগ্য জ্বালানী ব্যবহারে আগ্রহী করবে ততই আমাদের মঙ্গল। সূর্য-পানি কিংবা বাতাসের উপর মালিকানা প্রতিষ্ঠার এখনই সময় নতুবা কখনোই নয়।