Monday, May 26th, 2014

বিশাল বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কী যায় আসে

২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্য প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা বাজেট হচ্ছে বলে খবরে প্রকাশ। চলতি অর্থবছরে মূল বাজেট ছিল ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। বৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ। সংশোধিত বাজেটের ভিত্তিতে তা ১৭ দশমিক ১৮ শতাংশ। উন্নয়ন বাজেট হবে ৭৯ হাজার ৩০ কোটি টাকা। চলতি বছরে তা ছিল ৬৫ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ৬০ হাজার কোটি টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হবে যথাক্রমে ৭ দশমিক ৩ ও ৭ শতাংশ। এ হিসাবে আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার ১৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি হতে পারে। বাজেটের আকার বৃদ্ধি হলেও ভর্তুকি কমানো হচ্ছে ২০ শতাংশ। অর্থাৎ এবারের তুলনায় আগামী বছর ভর্তুকি কমবে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। ভর্তুকি কমানোর শর্তে বাংলাদেশ আইএমএফের ঋণসহায়তা পাচ্ছে ৭ কিস্তিতে ১০০ কোটি ডলার। ফলে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতে ভর্তুকি কমাতে হবে। আবার গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপারে আন্তর্জাতিক ঋণসহায়তাকারী সংস্থার চাপ অব্যাহত রয়েছে। সুতরাং জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপারে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অশনিসংকেত আসছে।
২০২১ সাল নাগাদ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্যে মাথাপিছু জিডিপি ২ হাজার ডলার হতে হবে। সেজন্য মাথাপিছু ব্যবহূত বিদ্যুতের পরিমাণ ৬০০ কিলোওয়াটআওয়ার নিশ্চিত করতে হবে। সে লক্ষ্যে পারসপেকটিড প্ল্যানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়নে গৃহীত পরিকল্পনায় যেসব বিনিয়োগ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, তা পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়নে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়।

২০১২ সালের হিসাবে দেখা যায়, প্রাথমিক জ্বালানি প্রবাহ প্রবৃদ্ধিতে গ্যাস ৫৮ শতাংশ, জৈব জ্বালানি ২৬ ও তরল জ্বালানি ১৬ শতাংশ। অন্যান্য জ্বালানির উপাংশ এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। বিদ্যুৎ উৎপাদন জ্বালানি মিশ্রে এখনো গ্যাসের পরিমাণ সিংহভাগ। বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাড়তি জ্বালানি চাহিদার বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ নেই। তরল জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধিই এখন একমাত্র ভরসা। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের তাগিদে তরল জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। অথচ ৭ শতাংশের অধিক হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ১০ শতাংশেরও অধিক হারে অব্যাহত থাকতে হবে। এ প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখার জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানি প্রবাহ প্রবৃদ্ধি সমানুপাতিক হারে অব্যাহত থাকতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে এ প্রবাহ প্রবৃদ্ধির নিশ্চয়তা নেই। বাজেটে বরাদ্দকৃত বিনিয়োগ কৌশলও তা নয়।
বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলত ব্যক্তি খাত বিনিয়োগনির্ভর। সরকারি বিনিয়োগে পিকিং বিদ্যুৎ প্লান্ট হয়। তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্লান্টও হয়। গ্যাসস্বল্পতা ও তরল জ্বালানি স্বল্প ব্যবহারের কারণে এসব প্লান্টের উৎপাদনক্ষমতা (মেগাওয়াট) খুবই স্বল্প ব্যবহার হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫ শতাংশও ব্যবহার হয় না। খুলনা বিদ্যুৎ প্লান্টের জন্য তা ছিল ১ শতাংশেরও কম। ফলে তার বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় হার ১০০ টাকারও অধিক।

অপরিকল্পিতভাবে বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণ হওয়ায় পিকিং প্লান্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়ায় মোট উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ। কিন্তু তা ২৫-৩০ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা নয়। উন্নয়ন সহযোগী আন্তর্জাতিক সংস্থার আগ্রহ ও উত্সাহের কারণে এমন পরিস্থিতি। তাদের কনসেশনাল ঋণ পাওয়ার শর্ত পূরণের কারণে সরকার এভাবে বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিপর্যয় এড়াতে পারছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় এ সংকট উপশম হচ্ছে না। বরং বিদ্যুতের মূল্যহার বৃদ্ধির অজুহাত তৈরি করছে। এ অবস্থায় বাজেট বিশাল হলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কিছু আসে যায় না।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন পথনকশায় গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনামতে, ২০১৫-১৬ সাল নাগাদ তেল-বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে আসবে ৯ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ইউনিট থেকে ৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ইউনিট পর্যন্ত। কয়লাবিদ্যুৎ শূন্য দশমিক ৯১ বিলিয়ন ইউনিট থেকে বেড়ে ৪ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ইউনিট হবে, আসবে এলএনজি বিদ্যুৎ শূন্য দশমিক ৯২ বিলিয়ন ইউনিট। পাশাপাশি আমদানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ আসবে ২ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ইউনিট। বিদ্যুৎ আমদানি আসতে শুরু করেছে। বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের সঙ্গে এসব বিদ্যুতের কোনো সম্পর্ক নেই। কয়লা ও এলএনজি বিদ্যুৎ উৎপাদন কোনো অগ্রগতি নেই। প্রস্তাবিত বাজেটে সে ব্যাপারে কোনো আশার আলো নেই। এর মধ্যে যৌথ উদ্যোগে সরকারি খাতে ১৩৫০ মেগাওয়াট কয়লাবিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের কার্যক্রম সরকার হাতে নিয়েছে। কয়লার সংস্থান এখনো হয়নি। অর্থায়নও নিশ্চিত নয়। কনসেশনাল ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বাজেটে যে বরাদ্দ থাকবে তা চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য। আবার সংশ্লিষ্ট বিদ্যুেকন্দ্রের কারণে সুন্দরবন ঝুঁকির মধ্যে থাকবে বলে আশঙ্কায় এ কেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠেছে। ফলে এ প্লান্টের অনিশ্চয়তা বেড়েছে। তাছাড়া পরিকল্পনাধীন ব্যক্তি খাত কয়লাবিদ্যুৎ উৎপাদন জ্বালানি ও বিনিয়োগ সংকটে থাকলেও বাজেটবহির্ভূত হওয়ার কারণে এর আকার-আয়তন বাড়লেও এ বিদ্যুতের কিছু আসে যায় না।

সাগর ও স্থলভাগের সব ব্লকের গ্যাস বিদেশী ব্যক্তি খাত বিনিয়োগে অনুসন্ধানের জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় তত্পরতা শুরু করেছে। এ তত্পরতায় প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আগ্রহ ও উত্সাহ বিশেষভাবে নজরে এসেছে। প্রতিমন্ত্রীর কথায় মনে হয়েছে, তিনি শেখানো পড়ানো মুখস্থ কথা বলছেন। অবশ্য এ বিষয়ে তার জানা-বোঝাইবা কতুটুকু। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, তিনি সতর্ক ও সাবধান হতেও জানেন না, জনস্বার্থ বিবেচনা করা তো দূরের কথা। যাদের সততা ও দেশপ্রেম বিতর্কিত, তারা মন্ত্রী হন কীভাবে? জাতি কতটা দুর্ভাগ্যের শিকার হলে এমন হয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট পরিচালকের (পিএসসি) এখতিয়ারবহির্ভূত তত্পরতায় অদৃশ্য এক ধরনের ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, জ্বালানি উপদেষ্টার সমর্থন ছাড়া এ তত্পরতা অসম্ভব। নাইকো চুক্তির প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ চুক্তির সূত্রপাত হয়েছিল তখনকার জ্বালানি সচিব বর্তমানে জ্বালানি উপদেষ্টার। আজ গ্যাস ব্লক নিয়ে যে তত্পরতা শুরু হয়েছে, তারও সূত্রপাত হলো জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রক জ্বালানি উপদেষ্টার হাতে। উভয় ক্ষেত্রের এমন অদ্ভুত সাদৃশ্যের কারণ নিশ্চয় জনগণ বোঝে। জ্বালানি খাত উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগস্বল্পতার কারণ এখানেই। স্ব-ক্ষমতা (ভত্ববফড়স) এবং সক্ষমতায় (পধঢ়ধনরষরঃু) সরকারের অবস্থান যথাযথ হলে আজ জ্বালানি খাত এমন অবস্থার শিকার হতো না।
গ্যাস খাতের মতোই বিদেশী বিনিয়োগে কয়লা খাত উন্নয়নের এমন তত্পরতা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ফলে বাজেটে জ্বালানি খাত উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ চোখ পড়ার মতো নয়। তবে গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থ গ্যাস খাত উন্নয়নে বিনিয়োগ হওয়ায় জ্বালানি খাত উন্নয়ন বাজেট শতকোটি থেকে হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অথচ এ অর্থ বিনিয়োগ বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানি প্রবাহ বা গ্যাসের মজুদ বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়নি। ফলে জ্বালানি খাত উন্নয়ন অর্থবহ হতে পারেনি।

সরবরাহ ব্যয় কমানোর জন্য সরবরাহকৃত গ্যাসে বিদেশী কোম্পানির ভাগের গ্যাসের পরিমাণ কম হওয়া জরুরি। সেজন্য দেশী কোম্পানির গ্যাসের পরিমাণ বাড়াতে হবে। তাই দেশী কোম্পানি বাপেক্স, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডের বিনিয়োগ সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভোক্তারা মাসিক বিলের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে ‘গ্যাস উন্নয়ন তহবিল গঠন’ করে। সে তহবিলে বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা জমা হচ্ছে। কিন্তু দেশী কোম্পানির বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়েনি। সরবরাহকৃত গ্যাসে দেশী কোম্পানির স্থলে বিদেশী কোম্পানির গ্যাসের অনুপাত বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, মন্ত্রণালয় গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থ সুদে খাটাচ্ছে। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে প্রস্তাবিত বাজেটে জ্বালানি খাতের জন্য বরাদ্দ কম-বেশিতে কী যায় আসে।

অর্থমন্ত্রী বললেন, চেষ্টা ছিল জিডিপির ৩২ শতাংশ বিনিয়োগ করা। কিন্তু ২৬-২৭ শতাংশের বেশি সম্ভব হয়নি। তিনি আরো বলেছেন, সরকারি বিনিয়োগ ১ শতাংশ হারে বাড়লেও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়েনি। অথচ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়নে বিনিয়োগ কৌশল হিসেবে ব্যক্তি খাত বিনিয়োগ আপস্ট্রিমে প্রাধান্য পাচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আপস্ট্রিম অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি অনুসন্ধান এবং উৎপাদনে কৌশলগত ও কর্মনীতিগত কারণে সরকারি বিনিয়োগ দ্রুত কমিয়ে আনা হচ্ছে। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। বেশি বেশি মুনাফার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাতে ব্যয় বাড়ায় মূল্যহার ক্রমে বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ঘাটতি সমন্বয় না হওয়ায় ভর্তুকি অব্যাহত রয়েছে। আবার এ ভর্তুকির অর্থ বাজেটে বরাদ্দ থাকে না। প্রস্তাবিত বাজেটেও থাকবে না। উন্নয়ন বাজেটভুক্ত অর্থ থেকে এ ভর্তুকির অর্থ অতীতেও এসেছে, প্রস্তাবিত বাজেটেও তার ব্যতিক্রম হবে না। চাহিদামতো ব্যক্তি খাত বিনিয়োগ আগেও আসেনি, আগামীতেও আসবে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ সংকট অতীতে নিরসন হয়নি, আগামীতেও হবে না। জ্বালানি নিরাপত্তা যে তিমিরে ছিল, সে তিমিরেই রয়ে যাবে।

উল্লিখিত কর্মনীতি ও কৌশল পরিহার করে ভর্তুকির অর্থ যদি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আপস্ট্রিমে সরকারি বিনিয়োগ হতো তাহলে ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে থাকত, এত বেশি মূল্যহার বাড়াতে হতো না। আর্থিক ঘাটতির পরিবর্তে মুনাফা হতো। সে মুনাফার মালিক কোনো ব্যক্তি নয়, জনগণ হতো। অথচ তা না হয়ে আর্থিক দায়ভার জনগণকে একদিকে ভর্তুকির অর্থ জুগিয়ে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার অত্যধিক বৃদ্ধিতে অস্বাভাবিক বাড়তি মূল্য দিয়ে বহন করতে হচ্ছে। তার পরও জনগণের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। রাষ্ট্র এমন কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হতে দিতে পারে না যে, তার জনগণ এমন পরিণতির শিকার হয়। তাহলে যে প্রজাতন্ত্র তথা রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, যে রাষ্ট্রের উৎপাদন, বিতরণ ও বণ্টন ব্যবস্থার মালিক জনগণ, সেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জনগণ এ পরিণতির শিকার হয় কীভাবে? প্রস্তাবিত বাজেট যত বড় হোক না কেন, তাতে এমন পরিণতি থেকে জনগণের কোনো পরিত্রাণ আসবে না। বাজেট সে উদ্দেশ্যে প্রণীতও হয় না।

তাহলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নে উন্নয়ন বাজেটের ভূমিকা কী? প্রস্তাবিত বাজেটে সে ভূমিকা কি অতীতেরই ধারাবাহিকতা মাত্র? এসব প্রশ্নে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংস্কার ফিরে দেখা দরকার। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিদেশী উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার পরামর্শে ও অর্থায়নে এ সংস্কারের শুরু। সে সংস্কারে বিভাজিত হয়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সেবা খাত থেকে নানা কোম্পানি হিসেবে বাণিজ্যিক খাতে পরিণত হয়। সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানির আওতায় সরকারি খাতে রয়ে যায়। গ্যাস ও বিদ্যুৎ উভয় খাতের সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যেই মূলত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত উন্নয়ন বাজেট। সেই সঙ্গে সরকারি খাতের পিকিং বিদ্যুৎ প্লান্টও অন্তর্ভুক্ত। সম্প্রতি এসব কোম্পানির ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিগত এক বছরে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির ব্যয় বেড়েছে শতভাগ। বিদ্যুৎ প্রবাহ বৃদ্ধিতে বিতরণ ব্যয় হ্রাস পায়। অথচ এক্ষেত্রে সে ব্যয় বেড়েছে মাত্রাতিরিক্ত। কারণ অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির কারণে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও জনবল ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিক। সঞ্চালনে সে হিসাব পাওয়া যায়নি। গ্যাসের চিত্র ভয়াবহ। গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে সঙ্গতিহীন সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের ফলে এক্ষেত্রেও ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিক। অবৈধ সংযোগ নিয়ন্ত্রণহীন। ফলে সিএনজি, আবাসিক ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ এসব উপখাতে নজিরবিহীনভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অসাধু ব্যবসার প্রসার বেড়েছে। ভয়াবহ গ্যাস সংকটে আছে সরকারি সার ও বিদ্যুৎ উপখাত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এভাবেই ব্যবসা হচ্ছে এবং উন্নয়ন বাজেট সে ব্যবসায় জ্বালানি জোগানোর কাজে আছে। তাই যে কেউ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়নে বাজেট গণবান্ধব হওয়ার পরিবর্তে অসাধু ব্যবসা ও দুর্নীতিবান্ধব হয়ে উঠছে বলতেই পারে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন গণবান্ধব হতে হলে এ খাতকে মুনাফামুখী নয়, গণমুখী হতে হবে। সেজন্য সবার আগে দরকার সরকারের স্ব-ক্ষমতা ও সক্ষমতা উন্নয়ন।