Wednesday, May 21st, 2014

কার সম্পদ কার হাতে

গত ৫ জানুয়ারির পর থেকে গত সরকারের নতুন মেয়াদ শুরু হয়েছে। গত আমলে এই সরকারের যেসব উদ্যোগ দেশকে আরও ঋণগ্রস্ত করেছে, সুন্দরবন থেকে বঙ্গোপসাগরকে হুমকির মুখে নিেক্ষপ করেছে, বিদ্যুৎ খাতকে কতিপয় দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর হাতে আরও বেশি করে আটকে দিয়েছে, তাদের মুনাফা নিশ্চিত করতে গিয়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে কয়েক দফা, দায়মুক্তি দিয়ে জ্বালানি খাতকে বানানো হয়েছে ‘তলাহীন ঝুড়ি’; সেসব কাজে এই মেয়াদে আরও দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে এই সরকার। প্রতিবাদ, যুক্তি, তথ্য—কোনো কিছুতেই তাদের পরোয়া নেই, পর্যালোচনা করার সাহস বা ইচ্ছা নেই। সরকারের বড় সুবিধা, দেশের বড় বিরোধী দল এসব চুক্তির বিরোধী নয়, বরং নিজেরা পাল্লা দিয়ে আরও চুক্তি করতে আগ্রহী। অপকর্মে তাদের ঐক্যের অভাব নেই।

সরকার খুব দ্রুততার সঙ্গে উন্নয়নের নামে একের পর এক যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যেভাবে চুক্তি করে সর্বজনের সম্পদ (পাবলিক প্রপার্টি) বিদেশি কোম্পানি ও দেশি কিছু গোষ্ঠীর ব্যক্তিমালিকানায় দিয়ে দিচ্ছে, তাকে কি উন্নয়ন বলা যায়? না। কেননা, উন্নয়ন তাকেই বলা যায়, যা সম্পদ সৃষ্টি করে, নতুন সম্পদ যোগ করে, দেশের মানুষের জীবন সহজ করে, উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণে সহায়ক হয়, দেশের সক্ষমতা বাড়ায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সৃষ্টি করে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জগৎ। সরকারের এসব সিদ্ধান্ত বরং এর উল্টোটাই করছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস্য মাত্রায় নির্লিপ্ততা দেখিয়ে, পরিবেশ সমীক্ষা না করে, অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা না করে, দেশের বিশেষজ্ঞদের মতামত থোড়াই কেয়ার করে, নিজস্ব সক্ষমতা না বাড়িয়ে, রাশিয়ার কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে তাদের পূর্ণ কর্তৃত্বে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজে কয়েক দফা চুক্তি করেছে সরকার। পরিবেশগত সমীক্ষা না করে চীনা কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মহেশখালী। সুন্দরবন ধ্বংসের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মতো ভারতীয় কোম্পানির কর্তৃত্বাধীন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজে একগুঁয়েমি দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি সরকার, সুন্দরবনের আরও কাছে আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের অরিয়ন কোম্পানিকে অনুমতি দিয়েছে।

পিএসসি ২০১২ সংশোধন করে চাহিদামতো আরও সুবিধা বাড়িয়ে বঙ্গোপসাগরের গ্যাস সম্পদ বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিতে চুক্তি শুরু করেছে সরকার। ইতিমধ্যে বাড়তি সুবিধা দিয়ে ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে। এখন আরও সুবিধা আদায়ের সম্ভাবনা দেখে মার্কিনসহ সব বিদেশি কোম্পানি তড়িঘড়ি নানা ব্যবস্থার লম্বা ফর্দ নিয়ে হাজির হয়েছে। এগুলো নিয়ে দর-কষাকষি তাদের তেমন করতে হয় না। অন্য পক্ষে নিজেদেরই বিশ্বস্ত লোক থাকলে তাদের চিন্তা কী?

৮ মে শেভরনের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নয় সদস্যের একটি দল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বেশ কিছু দাবি উত্থাপন করে। এর মধ্যে যেগুলো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো, তাদের কাছ থেকে কেনা গ্যাসের দাম আরও বৃদ্ধি করা। উল্লেখ করা দরকার যে বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সংস্থাগুলো যে দামে গ্যাস সরবরাহ করে লাভ করছে, বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে একই পরিমাণ গ্যাস কিনতে হয় তার ১০ গুণেরও বেশি দামে, বৈদেশিক মুদ্রায়। অর্থাৎ যদি জাতীয় সংস্থাগুলোকে কাজের সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে আমাদের গ্যাস ও বিদ্যুৎ অনেক কম দামে পাওয়া সম্ভব হতো, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ত না, ভর্তুকি দিতে হতো না। সর্বোপরি বিদেশি কোম্পানির হাতে জিম্মি হতো না দেশ, যে সুযোগে তারা কদিন পরপরই নতুন নতুন আবদার নিয়ে হাজির হয়। সে কারণেই তারা স্থলভাগে আরও ব্লক দেওয়ার দাবি উত্থাপন করতে পারছে। এ রকম আত্মঘাতী পথে সরকার যাচ্ছে এমন এক সময়, যখন বাপেক্স তার সম্পদের হাজারো সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আন্তর্জাতিক মান প্রদর্শন করেছে, ত্রিমাত্রিক জরিপ সম্পন্ন করেছে সফলভাবে। শেভরন এখন তাকে ভাড়া করে কাজ করাতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। মানে বাংলাদেশের তরুণ বিশেষজ্ঞরা অনেক কম সুবিধা পেয়েও নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করলেও তাঁরা কর্তৃত্ব পাবেন না, তাঁদের বড়জোর সাবকন্ট্রাক্টর পর্যন্ত যেতে দেওয়া হবে।

শেভরন বর্তমানে বাংলাদেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের শতকরা প্রায় ৫৫ ভাগ সরবরাহ করে। যে ব্লকগুলো এই কোম্পানির হাতে, তার মধ্যে তিনটি গ্যাসফিল্ডে তারা কাজ করছে। এগুলো হলো মৌলভীবাজার, বিবিয়ানা ও জালালাবাদ। সামগ্রিক পরিপ্রেিক্ষত ও বিভিন্ন সরকারের ভূমিকা না জানলে এটা মনেই হতে পারে যে বাংলাদেশের অক্ষমতা থাকার কারণে শেভরন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং তাদের জন্যই আজ গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো। শেভরনের মতো বিদেশি কোম্পানিকে জায়গা দেওয়ার জন্যই বরং জাতীয় সংস্থার গলা-হাত-পায়ে ফাঁস পরানো হয়েছে, তার কর্মক্ষমতা শৃঙ্খল করা হয়েছে, কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বরং অনেক বেশি সম্পদ ও সুযোগ দিয়ে উৎপাদন বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে সমৃদ্ধ গ্যাস ব্লকগুলো। আগে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র জালালাবাদও এর অন্তর্ভুক্ত।

এসব চুক্তি করা হয়েছিল প্রধানত দুটো যুক্তি দেখিয়ে: বাংলাদেশে ‘পুঁজির অভাব’ এবং ‘দক্ষতা ও প্রযুক্তির অভাব’। যে পরিমাণ পুঁজি হলে জাতীয় সংস্থা এই গ্যাস উত্তোলন করতে পারত, পরে তার ৩০ গুণ বেশি খরচ করে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনতে হয়েছে, হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আর পুঁজির অভাবের

কথা শোনা যায় না। আর বিদেশি কোম্পানির প্রযুক্তি ও দক্ষতার পরিচয় আমরা পেয়েছি মাগুরছড়া আর টেংরাটিলায়।

শেভরনের ব্লকগুলো আদিতে পেয়েছিল মার্কিন আরেকটি প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টাল। তাদের কর্তৃত্বাধীনেই ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন ঘটে মাগুরছড়া বিস্ফোরণ। তদন্তে দেখা যায়, অবহেলা ও কাজে গাফিলতিই এই দুর্ঘটনার কারণ। তদন্ত কমিটি নিয়ে অনেক নাটকের পর যে রিপোর্ট হয়, সেখানে পাওয়া যায়, আমাদের প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নষ্ট হয়েছে। গত দেড় বছরে সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহৃত হয়েছে, এটি তার সমান। এই বিপুল পরিমাণ গ্যাস সম্পদ ধ্বংস ও পরিবেশগত ক্ষতির জন্য যারা দায়ী, তাদের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি না করে বরং তাদের কীভাবে বাঁচানো যায়, সে চেষ্টাটাই আমরা বরাবর দেখেছি। যে পরিমাণ গ্যাস বাংলাদেশ অক্সিডেন্টালের কারণে হারিয়েছে, বর্তমানে এই পরিমাণ গ্যাস সংগ্রহের দাম বিবেচনা করলে শুধু গ্যাস বাবদ ক্ষতিপূরণই আমাদের দাবি করা উচিত কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা। অক্সিডেন্টাল তার ব্যবসা বিক্রি করে আরেকটি মার্কিন কোম্পানি ইউনোকলের কাছে এবং ক্ষতিপূরণ না দিয়ে দেশত্যাগ করে বিনা বাধায়।

ইউনোকল দায়িত্ব নিয়ে বিবিয়ানার গ্যাস সম্পদ ভারতে রপ্তানি করার জন্য ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। সরকার পরিবর্তন হলো ২০০১ সালে, তৎপরতা আরও বাড়ল। যারা আজও বিদেশি কোম্পানির হাতে সমুদ্র ও ভূমির সব খনিজ সম্পদ তুলে দিতে সরকারের ভেতর ও বাইরে থেকে সক্রিয়, তাদের মধ্যেই সেই ব্যক্তিদের পাওয়া যাবে, যাঁরা সে সময়ে এই ভয়াবহ প্রস্তাবকে দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করেছিলেন। এঁরাই গলা ফুলিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে! তাঁদের চেষ্টা সফল হলে বাংলাদেশের বর্তমানে সর্বোচ্চ গ্যাস জোগানদার বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে কোনো গ্যাসই বাংলাদেশ পেত না, লোডশেডিং আরও ভয়াবহ হতো, রপ্তানি আয়ও চুক্তির কারণে প্রায় পুরোটাই পেত কোম্পানি। আর সমপরিমাণ জ্বালানি হিসেবে তেল আমদানি করতে গিয়ে বাংলাদেশকে প্রতিবছর খরচ করতে হতো প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশ রক্ষা পেয়েছিল একদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক অন্যদিকে জনপ্রতিরোধের কারণে। জাতীয় কমিটি তখন একাধিক লংমার্চ ছাড়াও জাতীয় এই প্রতিরোধ সংগঠিত করেছিল।

ব্যর্থ হয়ে ইউনোকল তার ব্যবসা বিক্রি করে শেভরনের কাছে। এবারও ক্ষতিপূরণ না দিয়ে ইউনোকল দেশ ত্যাগ করতে সক্ষম হয়। এখন শেভরন সেই বিবিয়ানা থেকেই গ্যাস সরবরাহ করছে। কিন্তু যেহেতু দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ মুনাফা তাদের লক্ষ্য, সেহেতু নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন করে বিপদাপন্ন করছে পুরো ফিল্ড। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে লাউয়াছড়া উদ্যানে জরিপ চালিয়েছে। বৃহত্তর সিলেট এলাকায় ‘করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি’ নামে প্রচারমূলক কাজ করছে, কিন্তু ক্ষতিপূরণের টাকা অনাদািয় রেখেছে।
নতুন দাবিদাওয়া নিয়ে শেভরন-প্রধান যখন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন, তখন কি তিনি এসব অনিয়ম আর ক্ষতিপূরণের বিষয় তুললেন? না। বরং তাঁদের আরও কী করে বাড়তি সুবিধা দেওয়া যায়, তাঁদের দখলিস্বত্ব আরও বাড়ানো যায়, সেই পথই ধরলেন। সুতরাং দাবিদাওয়া পেশের ছয় দিনের মাথায় গত ১৪ মে এক সভা অনুষ্ঠিত হলো। এর কিছু খবর সংবাদপত্রে এসেছে। বলা হয়েছে, সভার একপর্যায়ে হঠাৎ করেই ‘পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) মুহাম্মদ ইমামুদ্দীন সব ব্লক বিদেশি কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তাব উত্থাপন করতে শুরু করেন। কিন্তু তা পেট্রোবাংলার পরিকল্পনায় না থাকায় এবং সংস্থার চেয়ারম্যান বিষয়টি সভায় উত্থাপনের বিষয়ে না জানায় তিনি পরিচালককে থামিয়ে দেন। এতে প্রতিমন্ত্রী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।’ (প্রথম আলো, ১৫ মে ২০১৪) মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের মুখে আমরা বিদেশি কোম্পানিগুলোর প্রসংশা ও তাদের আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কথাই বরাবর শুনি। বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে কথা বলার সুযোগ তাদের হয় না, তাদের যেন সেটা কাজও নয়! কেউ বলতে চাইলে বরং তার ‘উন্নতির পথ’ বন্ধ হয়ে যায়।

বহুজাতিক কোম্পানির বৃহৎ ব্যবসা বাগানোর জন্য যারা পেশাদার মিশনে বিভিন্ন দেশে অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে আসে, প্রজেক্ট নামে উন্নয়নের ভুয়া গল্প তৈরি করে, নীতিনির্ধারকদের লোভের জালে আটকানোর কাজ করে, তাদের আরেক নাম ‘ইকোনমিক হিটম্যান’। এ রকম একজন জন পারকিনস, হয়তো নিজের অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে, নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন দুটো গ্রন্থ। জানিয়েছেন বাংলাদেশের মতো বিভিন্ন দেশে কীভাবে বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় দুর্বৃত্তজাল তৈরি হয়, ঘুষ ও কমিশনে কেনা হয় মন্ত্রী-আমলা আর কনসালট্যান্টদের, উন্নয়নের গল্প সাজিয়ে মানুষকে ভয়ংকর প্রতারণায় আটকে তাদের খনিজ সম্পদ ও জীবন লুট করা হয়। বোঝা যাচ্ছে, এখন দেশ চালাচ্ছে এই ‘হিটম্যানরাই’!