Sunday, August 5th, 2012

কয়লা আমাদের ভবিষ্যৎ হতে পারে না

বিশ্বব্যাপী কয়লাবিরোধীদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমার অনেক দিনের। ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় কয়লা জ্বালানির পক্ষে ‘বিশেষজ্ঞ’দের এত বেশি লেখা প্রকাশিত হতে শুরু করে যে আমাদের সবারই কয়লা নিয়ে কমবেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের সিংহভাগ আসে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে। সরকারও ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ নিয়ে ব্যাপক চিন্তিত; জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব খোদ প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তবে ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ বলতে সাধারণ মানুষ যা বোঝে, সরকার বোঝে ঠিক তার উল্টোটি। যেমন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’ রক্ষার স্বার্থে জীবাশ্ম জ্বালানি (যেমন: কয়লা) বিদেশে রপ্তানি করার জন্য সরকার সদা তৎপর। সরকারের এই অবস্থান বুঝতে সবচেয়ে ভালো সাহায্য করে ‘ফুলবাড়ী কয়লাখনি প্রকল্প’। প্রকল্পটির মালিক গ্লোবাল কোল ম্যানেজমেন্ট (জিসিএম)। কোম্পানিটি বাংলাদেশের গণরায় উপেক্ষা করে ও বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমতির তোয়াক্কা না করে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে বাংলাদেশের কয়লা দেখিয়ে এখনো ব্যবসা করে যাচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে, উত্তরবঙ্গের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষকে বাস্তুহারা করে, ১০ হাজার হেক্টর এলাকার কৃষিজমিতে উন্মুক্ত কয়লাখনি করে, ৩০ বছর ধরে জিসিএম প্রায় ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলন করবে। এখানেই শেষ নয়। সব কয়লা আমরা ব্যবহার করতে পারব না—এই অজুহাতে যখন কয়লা বিদেশে রপ্তানি শুরু হবে, নৌপথে তখন বিপর্যয়ের মুখে পড়বে আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের সুন্দরবন।
গবেষণার সূত্র ধরে যে কয়জন কৃষক, খেতমজুর, ছোট দোকানদার, গৃহবধূ, দাই, ফেরিওয়ালা, রিকশাওয়ালা, ভ্যান-রিকশা, ঠেলাগাড়ি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক পেশার সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে তারা মনে করে, ফুলবাড়ীর কয়লার মান বিশ্বে নজিরবিহীন। আর তারা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্যই এই কয়লা ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু সাধারণ মানুষ জ্বালানি নিরাপত্তা ও মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখে না। তাই তারা মানুষকে উদ্বাস্তু করে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মাটি-পানি-বাতাস বিষাক্ত করে কয়লাখনি করতে দিতে চায় না। আবার তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও আশাবাদী নয়। আস্থা নেই তাদের সরকারের ওপর যে সরকার সাধারণ জনগণের কথামতো চলবে। তাই নিরুপায় হয়ে তারা কয়লাখনির বিরোধিতা করতে জড়ো হয়, বুক পেতে দেয় গুলির সামনে, বাঁচার জন্য তাদের মরে যেতে দ্বিধা হয় না।
দেশের পরিস্থিতি যখন এ রকম তখন তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে কয়লাখনি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধীদের তিন দিনব্যাপী (১৮-২০ জুলাই) একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হবে জেনে সেখানে যোগ দেওয়ার সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করলাম না। সম্মেলনে আলোচিত হলো বিশ্বের কয়লা আহরণ ও ব্যবহার পরিস্থিতি। জেনে খুব ভালো লাগল যে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী কার্বন বেশি নির্গমনের জন্য কুখ্যাত দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দিচ্ছে। নতুন করে তারা আর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বানাচ্ছেও না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি বললেন যে এটা তাদের সরকারের কৃতিত্ব নয়। জনমতের চাপের কারণেই সরকার ও বিনিয়োগকারীরা এ রকম সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। যুক্তরাজ্যেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট একের পর এক বন্ধ হচ্ছে। একই পথ অনুসরণ করছে জার্মানি ও ফ্রান্স। উন্নত বিশ্বের কয়লাবিরোধীরা এখানেই থেমে নেই। যেসব ব্যাংক সাধারণ নাগরিকদের টাকা কয়লাখনি বা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ করছে (যেমন, এইচএসবিসি, সিটি ব্যাংক) তাদের পেছনেও তারা লেগেছে, যেন তারা কয়লার ওপর বিনিয়োগ না করে। বিনিয়োগকারীদের এখন তারা বোঝাচ্ছে যে কয়লার বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের বিরোধিতার কারণে এই খাতে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। তারা কয়লার বদলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তি (যেমন: সৌরশক্তি) ব্যবহারের জন্য বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দিচ্ছে।
ইস্তাম্বুলে কয়লা সম্মেলনে যা শিখলাম তার সবকিছুই একেবারে নতুন নয়। আমরা তো জানিই যে কয়লা পোড়ালে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ তৈরি হয়। পৃথিবী উত্তপ্ত হচ্ছে সে কারণে। কয়লা সম্মেলনে শিউরে উঠেছিলাম ভিয়েতনামের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্গত ছাইচাপা পড়া মানুষ, চাষের জমি আর গ্রামের ছবি দেখে। বাকহারা হয়ে গিয়েছিলাম জেনে যে কয়লা থেকে নির্গত বিষাক্ত পদার্থের প্রভাবের কারণে খনি এলাকায় শতকরা ৫৬ ভাগ শিশু মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মাচ্ছে। কয়লার অতীত বিশ্বের সব সচেতন নাগরিকের কাছেই পরিষ্কার। বাংলাদেশেও যারা ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত কয়লাখনি প্রকল্পের এবং রামপালের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা করছেন, তাঁরাও প্রায় একই কথা বলছেন। আমাদের দেশের উৎপাদনশীল একমাত্র কয়লাখনি বড়পুকুরিয়ায় আমরা দেখেছি একরের পর একর জমি তলিয়ে গিয়ে সচ্ছল কৃষক হয়েছে নিঃস্ব, গেরস্থালির মানুষ হয়েছে ঘরহারা, ডিপ টিউবওয়েল হয়েছে পানিশূন্য। সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পেতে গিয়ে বড়পুকুরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ একবার মাস্তানদের হাতে, আরেকবার পুলিশের হাতে মার খাচ্ছেন। তার মানে কয়লা শুধু পরিবেশ-বিপর্যয়ই না, সামাজিক, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও ডেকে আনে।
এখন প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, আমাদের বিদ্যুৎ দরকার, কিন্তু কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন চলবে না, তাহলে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভবিষ্যৎ কী? আসলে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনাটিই আমার এই কয়লা সম্মেলন থেকে নতুন প্রাপ্তি। সম্মেলনে দেখছিলাম, বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত। উন্নত বিশ্বের কয়লাবিরোধীরা তাদের দেশের কয়লা প্রকল্পগুলো বন্ধ হচ্ছে বলে খুশিতে ডগমগ, নতুন উদ্যমে তারা কাজ করছে নবায়নযোগ্য শক্তি বিষয়ে এবং এই খাতে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার কৌশল নির্ধারণে। অপর দিকে আমরা যারা কম উন্নত দেশের কয়লাবিরোধী, তারা নিজেদের শক্তি ক্ষয় করছি, উন্নত বিশ্বের বাতিল করা প্রযুক্তি (যেমন: কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র) আমাদের দেশে আসা ঠেকানোর আন্দোলন করতে। অথচ, বাংলাদেশের সরকার যদি এত দিনে নবায়নযোগ্য শক্তির বিষয়ে গবেষণা করতে বিনিয়োগ করত, ব্যবসায়ীরা যদি নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোতে টাকা ঢালতেন, তাহলে আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের আশা করতে পারতাম। ৪০ বছর আমরা ধুঁকে ধুঁকে কাটিয়ে দিলাম। সময় কি এখনো আসেনি ফসিলের কথা বাদ দিয়ে আমাদের যে সন্তানেরা আজ এসেছে বা কাল আসবে, তাদের কথা ভাবার?
নাসরিন সিরাজ: নৃবিজ্ঞানী ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা।