Monday, March 10th, 2014

বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি: শাসকদের লুটপাটের দায় জনগণ কেন নেবে?

১. বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির জন্য পিডিবি এবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে যে প্রস্তাব জমা দিয়েছে, সেই প্রস্তাবের সাথে পিডিবি’র আগের বারে ২০১২ সালের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাবের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য রয়েছে। আগের বারের প্রস্তাবে এবারের প্রস্তাবের মতোই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি হিসেবে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যায় বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিলো। কিন্তু পার্থক্য হলো, আগের প্রস্তাবে এই উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট করে স্বীকার করা হয়েছিলো: “তরল জ্বালানির ব্যাবহার, বেসরকারি খাত হতে বিদ্যুৎ ক্রয় এবং জ্বালানী ব্যয়ের অংশ বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। ” সেই প্রস্তাবে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে দেখানো হয়েছিলো- তেল ব্যাবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ গ্যাস ব্যাবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের চেয়ে ৬ থেকে ৮ গুণ বেশি এবং কয়লা ব্যাবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের চেয়ে আড়াই থেকে ৩ গুণ বেশি।

সূত্র: http://www.berc.org.bd/images/stories/pdf/pdb_bulk_application%202012.pdf

ফলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই তখন প্রশ্ন উঠেছিলো, তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ গ্যাস বা কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হওয়া স্বত্ত্বেও কোন যুক্তিতে তেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়েই যাচ্ছে এবং তার দায় বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের ঘাড়ে চাপাচ্ছে।

আমরা তখন দেখিয়েছিলাম, বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয়মুল্যের মধ্যেকার ঘাটতি কমানোর জন্য বিদ্যুতের বিক্রয় মূল্য বাড়ানোর দিকে সরকারের যত আগ্রহ তার সামান্যও যদি কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে থাকতো, তাহলে গ্যাস সংকটের কথা বলে ব্যায়বহুল বেসরকারি তেল ভিত্তিক কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের দিকে ঝুকতো না সরকার, গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর যথাযথ উদ্যোগ নিত, পুরোনো বিদ্যুৎ মেরামত করে ও কম্বাইন্ড সাইকেলে রুপান্তর করে ইফিসিয়ান্সি বাড়ানোর মাধ্যমে একই পরিমাণ গ্যাস থেকে বেশি পরিমাণ বিদ্যুৎ সস্তায় উৎপাদনের উদ্যোগ নিত।

এবার আর পিডিবি সেই ভুল করেনি- বেসরকারি খাত থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার কথাটি স্রেফ চেপে গিয়ে শুধু বলেছে-“ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর জন্য বিউবো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস এর সর্বরাহ না পাওয়ায় ব্যয় বহুল তরল জ্বালানীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও তরল জ্বালানীতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে।“
সূত্র: http://www.berc.org.bd/images/EnergyStats/retail%20tariff%20proposal_pdb…

কিন্তু পিডিবি যে বেসরকারি খাতের কাছ থেকে এই তরল জ্বালানীতি উৎপাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় করতে “বাধ্য” হচ্ছে- তার কথা এই প্রস্তাবে নাই। এমনকি ক্যাপাসিটি চার্জের নামে কুইক রেন্টাল মালিকদেরকে যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও পিডিবিকে পরিশোধ করতে হচ্ছে- সে কথাও বোধগম্য কারণেই চেপে যাওয়া হয়েছে। চেপে যাওয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মেরামত ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে প্রাপ্ত গ্যাস ব্যাবহার করেই দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ নষ্ট করার কথা। অথচ এগুলোই কিন্তু বেসরকারিখাতের কাছ থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে “বাধ্য” করেছে পিডিবিকে যার ফলে আজকে বার বার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির খেসারত দিতে হচ্ছে জনগণকে।

২. মহাজোট সরকার গত টার্মে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের কথা বলে কুইক রেন্টাল লুন্ঠন প্রকৃয়া চালু করে। আমাদেরকে বলা হয় দেশে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে, ফলে দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য তেল-ভিত্তিক কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট বসানো ছাড়া কোন উপায় নেই। বলা হলো, কুইকরেন্টাল প্ল্যান্ট যেহেতু ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে চালূ করা যাবে তাই বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানও কুইক হবে। ৩ থেকে ৬ মাসের কথা বলা হলেও কোন কুইক রেন্টালই সময় মতো চালু হয়নি এবং পরে যাও চালূ হয়েছে, নষ্ট ও পুরাতন যন্ত্রপাতি ব্যাবহার করার কারণে ঘোষিত উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সবসময়ই কম হয়েছে। এভাবে বেশি দামে কুইক রেন্টাল থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ অনিয়মিত ভাবে পাওয়া যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ নষ্ট ও পুরাতন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মেরামত করলেই পাওয়া সম্ভব হতো।

নষ্ট ও বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মেরামত করার পাশাপাশি পুরাতন বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে আধুনিকায়ন করে থার্মাল ইফিসিয়ান্সি বা তাপীয় কর্মদক্ষতা বাড়ানো জরুরী। প্রতিবছর একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইফিসিয়ান্সি ০.২% করে কমতে থাকে। ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরাতন হয়ে গেলে ব্য়লার, টারবাইন, জেনারেটর ইত্যাদির মেরামত ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে যেমন ইফিসিয়ান্সি বাড়ানো যায় তেমনি সিম্পল সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরিণত করে নির্গত তাপকে পুনরায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যাবহার করা যায়। এভাবে একটি গ্যাস ভিত্তিক সিম্পল সাইকেল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্যাস টারবাইন হতে নির্গত তাপকে হিট এক্সচেঞ্জারের মাধ্যমে আরেকটি স্টিম টারবাইনে চালনা করে একই পরিমাণ জ্বালানিতে আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। রাষ্ট্রীয় পুরাতন যেসব গ্যাস ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বর্তমানে আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, সেগুলোকে মেরামত করে কম্বাইন্ড সাইকেলে পরিণত করা হলে একই পরিমাণ গ্যাস দিয়ে দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত।অর্থাৎ কুইক রেন্টালের মাধ্যমে অতি উচ্চমূল্যে আমরা যেটুকু বিদ্যুৎ কিনছি তারচেয়ে আরো বেশি বিদ্যুৎ খুব সস্তায় আমরা পেতে পারতাম।

এ কথাগুলো আমরা বহুবার বলেছি, এক পর্যায়ে পত্রপত্রিকাতেও এ বিষয়ে রিপোর্ট হয়েছে। যেমন: একটি রিপোর্ট এ বিষয়ে বলা হয়েছে: “দেশে এখন প্রতিদিন গ্যাস উ ৎপাদন হচ্ছে গড়ে ২২৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে প্রায় ৪০ কোটি ঘনফুটই অপচয় হচ্ছে। অথচ চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি চলেছে।অপচয়ের মূল জায়গাগুলো হলো বিদ্যু ৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতেও প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। সরকারি সূত্র এবং বেসরকারি পর্যায়ের গবেষকেরা জানান, পুরোনো বিদ্যু ৎকেন্দ্র ও সার কারখানার অদক্ষ যন্ত্রপাতি এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সেকেলে প্রযুক্তির বয়লার এই অপচয়ের কারণ। এ ছাড়া সূত্রগুলো জানায়, বর্তমানে দেশে প্রতিদিন উৎপাদিত প্রায় ২২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ, সার ও শিল্পপণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে, যন্ত্রপাতির দক্ষতা বাড়ানো হলে সর্বোচ্চ ১৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করেই তা করা সম্ভব। অর্থাৎ বর্তমানে চাহিদার তুলনায় দেশে দৈনিক গ্যাসের যে প্রায় ৮০ কোটি ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে, অপচয় বন্ধ করে তার অর্ধেক পূরণ করা সম্ভব।

…দেশের সবচেয়ে বড় বিতরণ কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি একটি জরিপ চালিয়ে দেখেছে, তাদের বিতরণ এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পুরোনো প্রযুক্তির বয়লার নতুন প্রযুক্তিতে রূপান্তর করে দৈনিক ১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব। এই রূপান্তরে ব্যয়ও বেশি নয়।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্র জানায়, তাদের গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলোর মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র তাপভিত্তিক (স্টিম থার্মাল)। এসব কেন্দ্রে গ্যাস পুড়িয়ে উৎপাদিত তাপ ব্যবহার করে টারবাইন ঘোরানো হয়।

এ ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি দক্ষতা (ফুয়েল ইফিশিয়েনসি) ৩৫ শতাংশের মধ্যে। কিন্তু এখন যে প্রযুক্তির গ্যাসচালিত বিদ্যু ৎকেন্দ্র করা হয় (কম্বাইন্ড সাইকেল) সেগুলোর দক্ষতা ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ। আগের ওই কেন্দ্রগুলো কম্বাইন্ড সাইকেলে রূপান্তর করা হলে প্রায় অর্ধেক জ্বালানি ব্যবহার করে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।

এ ব্যাপারে সরকারি সূত্রগুলোর বক্তব্য হচ্ছে, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে অনেক কম থাকায় এবং অর্থ সংকটের কারণে পুরোনো কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে কম্বাইন্ড সাইকেলে রূপান্তর করার সুযোগ কখনো পাওয়া যায়নি।

পিডিবি সূত্র জানায়, আরও প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে যেগুলোর জ্বালানি দক্ষতা সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। এই কেন্দ্রগুলোতে যে পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহূত হচ্ছে সেই একই পরিমাণ জ্বালানি দিয়ে দ্বিগুণ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে পারে। কিন্তু সে জন্য ওই কেন্দ্রগুলো নবায়নের (বিএমআরই) জন্য বিপুল অর্থের দরকার। তবে সেই অর্থের পরিমাণ অপচয় হওয়া জ্বালানির তুলনায় অনেক কম।

বিদ্যুতে আরেকটি বড় অপচয়ের ক্ষেত্র ক্যাপটিভ পাওয়ার (বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যু ৎ উ ৎপাদন)। এ ক্ষেত্রে কম দামে গ্যাস দেওয়া হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের দক্ষতা ক্ষেত্রবিশেষে ২০ শতাংশেরও কম।

…ইউরিয়া সার কারখানাগুলোতেও জ্বালানির অপচয় বিদ্যুতের মতোই ব্যাপক। কর্ণফুলী সার কারখানা (কাফকো) বিদেশি বিনিয়োগে স্থাপিত একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। এই কারখানায় এক মেট্রিক টন ইউরিয়া উ ৎপাদন করতে গ্যাস ব্যবহূত হয় ২৪ হাজার ঘনফুট। সরকারি কারখানাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ যমুনা সার কারখানায় এক টন ইউরিয়া উ ৎপাদনে গ্যাস ব্যবহূত হচ্ছে ৩২ হাজার ঘনফুট। চিটাগাং সার কারখানায় ব্যবহূত হয় ৪২ হাজার; ঘোড়াশালের জিয়া ও পলাশ সার কারখানায় ব্যবহূত হচ্ছে যথাক্রমে ৪৩ ও ৪৯ হাজার ঘনফুট। আশুগঞ্জের সার কারখানায় ব্যবহূত হচ্ছে ৭৩ হাজার ঘনফুট। আর ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানায় এক মেট্রিক টন ইউরিয়া ব্যবহার করতে গ্যাস লাগে ৮২ হাজার ঘনফুট। প্রতিদিন হাজার হাজার মেট্রিক টন সার উ ৎপাদনে এভাবে গ্যাসের অপচয় হচ্ছে।“
সূত্র: http://www.prothom-alo.com/detail/date/2013-07-05/news/365333

তাহলে যে গ্যাস সংকটের অযুহাত দিয়ে বেসরকারি কুইকরেন্টালের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক কম খরচে সে গ্যাস সংকট সমাধান করে সস্তায় কুইক রেন্টালের চেয়ে আরো বেশি পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। অথচ সে রকম কোন উদ্যোগ না নিয়ে বার বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে।

৩. বার বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পেছনে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো- বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে বিদ্যুৎ বাণিজ্য বেসরকারি ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা। রাষ্ট্রীয় খাতে যদি সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় এবং যদি সস্তায় সেই বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌছে দেয়া যায় তাহলে তো দেশি বিদেশী প্রাইভেট কোম্পানির জন্য এই খাতে বিনিয়োগের সুযোগ থাকেনা বা বিনিয়োগ করলেও বেশি মুনাফা লোটা সম্ভব হবে না। সেই কারণেই একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্রমশ বেসরকারিকরণ করা হচ্ছে, ব্যায়বহুল তরল জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদিন বাড়ানো হচ্ছে, উৎপাদিত বিদ্যুৎ বেশি দামে এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পেছনে তিনশ থেকে হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করা হচ্ছে অন্যদিকে বেসরকারিখাতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ থেকে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। যেমন: বণিক বার্তার রিপোর্ট অনুসারে- “চুক্তি অনুযায়ী ৭ টাকা ৭৮ পয়সায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কেনার কথা সরকারের। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) গড়ে বিদ্যুৎ কিনেছে ১৮ টাকা ২১ পয়সায়। আগের বছর এটি ছিল ১৮ টাকা ৯১ পয়সা। এর মধ্যে গত নভেম্বরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে পিডিবির ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। পাওয়ারপ্যাকের ফার্নেস অয়েলচালিত ১০০ মেগাওয়াট কুইক রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনায় এ ঘটনা ঘটেছে।“
সূত্র: http://www.bonikbarta.com/first-page/2013/07/09/7855

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্য যতটা না বিদ্যুৎ বিতরকারণী কোম্পানি যেমন: ডিপিডিসি, ডেসকো, আরইবি ইত্যাদিকে লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করা তার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারি দেশী বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মুনাফার জন্য উপযুক্ত করা। একারণে আমরা বরাবরই দেখি বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো দায়সারা গোছে গোজামিল পূর্ণ আবেদনের মাধ্যমে বাড়তি লোকসান প্রদর্শন করে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির আবেদন করে এবং বিইআরসিও একই ভাবে দায়সারা গোছে লোক দেখানো গনশুনানি করে আসলে পূর্বনিধারিত এবং মন্ত্রণালয় নির্দেশিত হারেই বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করে। এই বিষয়টা আসলে এখন অনেকটা ওপেন সিক্রেট, যেমন এ বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে-

“মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) বিদ্যুতের দাম অস্বাভাবিক বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে….দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ার কথা বিইআরসি আইন, ২০০৩ অনুযায়ী। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের কোনো পরামর্শ বা হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয়। স্বতন্ত্র কমিশন হিসেবে বিইআরসির কাছে সংস্থাগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে প্রস্তাব করার কথা। তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাবের ভিত্তিতে দাম নির্ধারণ করবে বিইআরসি। এর ব্যত্যয় হলে বিইআরসির স্বতন্ত্র সত্তা থাকে না। আর তেমন বিইআরসির দরকারও থাকে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাস্তবে এবার দাম বাড়ানোর সব প্রক্রিয়াই শুরু হয়েছে সরকারি নীতি-নির্ধারকদের উদ্যোগে। তাঁরা কোম্পানিগুলোকে প্রস্তাব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সবগুলো কোম্পানি একই দিনে, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রস্তাবগুলো বিইআরসির কাছে পাঠানো এই তথ্যকে সমর্থন করে।

এখন সরকারি পর্যায় থেকেই শোনা যাচ্ছে, কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব কিংবা শুনানিতে যা-ই হোক না কেন, আগামী সপ্তাহে উল্লিখিত নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে বিইআরসির অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হবে। বিদ্যুতের দাম কোন পর্যায়ে কতটা বাড়বে তা সেখানেই নির্ধারিত হবে।”
সূত্র: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/162250/

৪.সবশেষে, বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয় মুল্যের মধ্যে ঘাটতি থাকলেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো অত্যাবশ্যকীয় কি-না, জনগণের জন্য কল্যাণকর কি-না সে বিষয়ে কয়েকটা বিষয় স্পষ্ট করা দরকার।

প্রথমত, ঘাটতি কমানোর জন্য উৎপাদন মূল্য যেন কম থাকে সেই উদ্যোগ নিতে হবে। উৎপাদন খরচ বাড়ানোর সমস্ত ম্যাকানিজম চালু রেখে বিক্রয় মূল্য বাড়ালে ঘাটতি কমে না, বরং দিনে দিনে ঘাটতি বাড়তে থাকে, ফলে বার বার দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে যা এই সরকারের আমলে ইতিমধ্যে ৫ বার দাম বাড়নোর পরও হাজার হাজার কোটি টাকা ঘাটতি’র ঘটনা থেকেই পরিস্কার বোঝা যায়।

দ্বিতীয়ত, তারপরও কোন কারণে যদি ঘাটতি রয়েই যায়, তাহলে ভর্তুকী প্রদান করতে হবে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে যেহেতু গোটা অর্থনীতিতে মাল্টিপ্লায়িং ইফেক্টের কারণে বিদ্যুৎ ব্যাবহার করে উৎপাদিত সকল পণ্যের দাম বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতির কারণে জনগণের দুর্ভোগ বাড়ে, তাই জনগণের দেয়া কর-ভ্যাটের অর্থের একটা অংশ জনদুর্ভোগ ঠেকানোর জন্য বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকী বাবদ বরাদ্দ করাই উচিত।

এ ক্ষেত্রে জনগণের টাকা জনগণের কাজেই লাগে যদি ভর্তুকীর অর্থ পাবলিক সেক্টরে যায়। কিন্তু বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি করণ করা হলে, বেসরকারি খাত থেকে ক্রমশ বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার অর্থ হলো পাবলিকের অর্থ প্রাইভেট সেক্টরে প্রদান, প্রাইভেট বিদ্যুৎ সেক্টরের বাড়তি মুনাফার নিশ্চয়তা বিধান- সেই বাড়তি অর্থ ভর্তুকী থেকেই আসুক কিংবা দাম বাড়িয়েই সংগ্রীহিত হোক- উভয় ক্ষেত্রেই তা কিন্তু পাবলিকেরই অর্থ। কাজেই বিদ্যুৎ খাতে জনগণের অর্থ জনগণেরই কাজে লাগানোর শর্ত হলো উৎপাদন খরচ কমানো এবং বেসরকারি খাতের হাত থেকে মুক্ত করে বিদ্যুৎ খাতে পাবলিক সেক্টরের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা।