Friday, June 29th, 2018

হালদার মাছ মরছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বর্জ্যে

সামান্য বৃষ্টিতেই হাটহাজারী বিদ্যুৎকেন্দ্রের তেলমিশ্রিত পানি ছড়া-খাল বেয়ে মিশছে হালদায়। এতে দূষিত হচ্ছে মাছের বৃহৎ প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রটি। কমে যাচ্ছে হালদার পানির পিএইচ ও দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা, যার প্রভাব পড়ছে জলজ প্রাণীর ওপর। ১৯ জুন থেকে হালদায় ভেসে উঠছে মরা মাছ। মাছের পাশাপাশি মারা যাচ্ছে ডলফিনও।

হালদায় মাছ মারা যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শন চালায় পরিবেশ অধিদপ্তর। হালদার দূষণের উৎস চিহ্নিত করে অধিদপ্তর এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনও তৈরি করেছে। ওই প্রতিবেদনেই মাছ মারা যাওয়ার কারণ হিসেবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ও গৃহস্থালি বর্জ্যের বিষয়টি উঠে এসেছে।

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং বিদ্যুৎকেন্দ্র কীভাবে হালদার দূষণ ঘটাচ্ছে, তা সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, এইচএফও ও এলএফও স্টোরেজ ট্যাংক থেকে বাফার ট্যাংকে নেয়া হয়। সেখান থেকে অয়েল-ওয়াটার সেপারেটরের মাধ্যমে পরিশোধনের পর ডে ট্যাংক স্টোরেজে নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়। পরিদর্শনে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দেখতে পান, ডে ট্যাংক উপচে জ্বালানি তেল নিচে পড়ছে। সামান্য বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ প্রকল্পের জ্বালানি তেলমিশ্রিত পানি গিয়ে পড়ছে পাশের মরা ছড়া ও খালে। সেখান থেকে জ্বালানি তেলমিশ্রিত পানি সাত্তারঘাট এলাকায় হালদা নদীতে গিয়ে মিশছে। এছাড়া বর্জ্য পরিশোধনাগারও (ইটিপি) নেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে। ইটিপি নির্মাণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেয়া হলেও শুধু পাইলিংয়ের মতো সামান্য কিছু কাজ হয়েছে।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপক মো. জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া বণিক বার্তাকে বলেন, পরিবেশ দূষণের মতো কোনো বর্জ্য আমাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বের হয় না। অন্য যেসব বর্জ্য তৈরি হয়, সেগুলো আমরা আলাদা পুকুরে সংরক্ষণ করছি। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি তেল নদীতে বা খালে মেশার সুযোগ নেই। তবে ইটিপি স্থাপনের প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। আড়াই মাসের মধ্যে এটি সম্পন্ন হবে।

গৃহস্থালি বর্জ্যকেও হালদা দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। ২৩ জুন পরিদর্শনে তারা দেখতে পান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও সানোয়ারা আবাসিক এলাকায় প্রচুর পরিমাণে কচুরিপানা, যেগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের গৃহস্থালি বর্জ্যও খালে ফেলা হচ্ছে। বর্ষাকালে এগুলো পচে উপরে ভেসে ওঠে এবং ঈদের আগে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় বর্জ্যগুলো পচে পানির সঙ্গে মিশে কালো রঙ ধারণ করে। ঈদের পর বৃষ্টি হলে সেগুলো হালদা নদীতে গিয়ে মিশেছে।

এ বিপর্যয়ের মাত্রা কী ধরনের, তা পরিমাপে ২১ জুন হালদা নদীর মোহনা, খালসহ মোট ১০টি পয়েন্টের পানির নমুনা সংগ্রহ করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এরপর পানির পিএইচ, দ্রবীভূত অক্সিজেন ও লবণাক্ততা পরীক্ষা করেন। তাতে হালদার কোনো কোনো পয়েন্টে প্রতি লিটার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন পাওয়া গেছে এক মিলিগ্রামেরও কম। কোথাও এক মিলিগ্রাম, কোথাও আরেকটু বেশি। অথচ পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা হওয়ার কথা প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম। ২৪ জুন দ্বিতীয় দফায় নমুনা পরীক্ষায় হালদার পানির মান কিছুটা ভালো পাওয়া যায়। তার পরও অধিকাংশ পয়েন্টে তা প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রামের নিচেই ছিল।

এ কারণেই হালদায় মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা গবেষক মনজুরুল কিবরীয়া বণিক বার্তাকে বলেন, হালদা পাড়ে অবস্থিত বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, আবাসিক ও পোলট্রি ফিডের বর্জ্য ক্রমাগত হালদায় এসে মিশেছে। আরো কিছু কারখানার বর্জ্য জমা হয়েছে নদীর পার্শ্ববর্তী ছড়াবিল, বোয়ালিয়ার বড় বড় বিলে। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর এসব বিলে দূষণ প্রকট হয়ে ওঠে। ঈদের সময় হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বন্যার পানির সঙ্গে এসব বিলের বিষাক্ত পানি খন্দকিয়া খাল, কাটাখালী খাল, মাদারী খাল দিয়ে হালদা নদীতে গিয়ে পড়ে। এতে আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে হালদার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা। মারা যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।

১৯ জুন থেকে এ পর্যন্ত ঠিক কী পরিমাণ মাছ মারা গেছে, সুনির্দিষ্টভাবে তা নির্ধারণ করা যায়নি। তবে দুই প্রজাতির চিংড়িসহ মোট ১৮ প্রজাতির মাছ মারা গেছে বলে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। সাত কেজি ওজনের আইড়, ১৫ কেজি ওজনের মৃগেল, তিন কেজি ওজনের বাইন মাছও মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এর আগে ২৫টি ডলফিনও মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় হালদা নদীতে।

জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সারওয়ার ইমতিয়াজ হাশমী বণিক বার্তাকে বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রেরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। তারা দায়িত্ব নিলে এ পরিস্থিতির সমাধান হবে। সরেজমিন পরিদর্শনের পর তৈরি করা প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাব। এরপর আমাদের এনফোর্সমেন্টের মাধ্যমে নজরদারি বাড়াব।

হালদা দূষণের উৎস খুঁজতে নন্দিরহাটের এশিয়ান পেপার মিল, হালদার পার্শ্ববর্তী চা বাগান, সেমুতাং গ্যাসক্ষেত্র ও মদিনা ট্যানারিও পরিদর্শন করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এশিয়ান পেপার মিলের উৎপাদন বন্ধ থাকায় এর মাধ্যমে হালদা দূষণের প্রমাণ পাননি তারা। এছাড়া হালদা-সংলগ্ন চা বাগানগুলোয় কোনো তরল বর্জ্য সৃষ্টি হয় না। সেমুতাং গ্যাস ক্ষেত্রে সামান্য কিছু তরল বর্জ্য সৃষ্টি হলেও অয়েল-ওয়াটার সেপারেটরের মাধ্যমে পরিশোধনের পর নিজস্ব ট্যাংকে তা সংরক্ষণ করা হয়। এরপর তা নিজস্ব পুকুরে ফেলা হয়। এছাড়া মদিনা ট্যানারির উৎপাদনও বন্ধ থাকায় এর মাধ্যমে হালদা দূষণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পরিদর্শন শেষে হালদার দূষণ রোধে বেশকিছু সুপারিশ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম মহানগর। তরল বর্জ্য সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানের ইটিপিগুলো যাতে কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, সেজন্য অনলাইন মনিটরিংয়ের কথা বলা হয়েছে। গৃহস্থালি বর্জ্য যাতে নদীতে ফেলা না হয়, সেজন্য হালদার পাশে বসবাসকারী বাসিন্দা, মদুনাঘাট বাজারসহ প্রতিটি বাজারের ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হয়েছে। কঠিন বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশনের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছে অধিদপ্তর।

দেশের মৎস্যসম্পদে হালদার ভূমিকা অপরিসীম। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে কার্প-জাতীয় ফিশ হ্যাচিংয়ের ১৮-১৯ শতাংশ আসত হালদা নদী থেকে। ২০১৩ সালে দেশে মোট ফিশ হ্যাচিং হয়েছে ৩ হাজার ৩২৬ কেজি। সেখানে হালদার অবদান ছিল ৬২৫ কেজি বা প্রায় ১৯ শতাংশ। পরের বছরও প্রায় ১৯ শতাংশ ছিল এ অবদান। ২০১৪ সালে মোট ফিশ হ্যাচিং হয় ২ হাজার ৬৯৫ কেজি, যেখানে হালদার পরিমাণ ছিল ৫০৮ কেজি। ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১০৭ কেজি ও ২০১৬ সালে ৩২০ কেজি। গত বছর মোট ৫ হাজার ৬৭ কেজি হ্যাচিংয়ে হালদার অবদান ছিল ৩৩৮ কেজি, যা মোট আহরণের ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। চলতি বছর হালদা থেকে যে পরিমাণ ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে, তাতে ফিশ হ্যাচিংয়ে নদীটির অবদান অনেক বাড়বে। তবে হঠাৎ হালদা নদীর দূষণের কারণে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, আগামী বছর ডিম সংগ্রহে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন হালদা বিশেষজ্ঞরা।

মূল সংবাদের লিংক: http://bonikbarta.net/bangla/news/2018-06-29/162591/%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%9B-%E0%A6%AE%E0%A6%B0%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%81%E0%A7%8E%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87/