Tuesday, July 17th, 2018

তীব্র জাহাজজটে বেহাল বন্দর

আমদানি করা পণ্য জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় প্রবেশের পরও মোটেই স্বস্তি পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। এর কারণ বন্দরের বহির্নোঙরে তীব্র জাহাজজট। পণ্য খালাসের জন্য কখন বন্দরের জেটি খালি পাওয়া যাবে, এ জন্য অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে (১৩ মে থেকে) প্রতিদিন গড়ে ১৫টি কনটেইনারবাহী জাহাজকে বন্দরের বহির্নোঙরে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। জেটিতে ভিড়তে পণ্যবাহী জাহাজের সর্বোচ্চ ১২ দিন পর্যন্ত সময় লেগেছে। স্বাভাবিক অবস্থায় ১ দিনের বেশি লাগার কথা নয়।

চট্টগ্রাম বন্দরে তীব্র জাহাজজটের বিষয়টি সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইটেও জায়গা করে নিয়েছে। জটের কারণে আগের চেয়ে বেশি সময় বন্দরে অবস্থান করতে হচ্ছে কনটেইনারবাহী জাহাজকে। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন বন্দর থেকে চট্টগ্রামমুখী পণ্য পরিবহনের (কনটেইনার) ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে জাহাজ কোম্পানিগুলো। এতে দেশের আমদানিকারক ও শিল্প উদ্যোক্তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আবার পণ্য হাতে পেতে আগের চেয়ে বাড়তি সময় লাগছে। কনটেইনারে আমদানি করা পণ্যের বড় অংশই পোশাকশিল্পের কাঁচামাল (কাপড়, তুলা, সুতা, বোতামসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম)।

চীনের শেনজেন, সাংহাই, নিংবো ও গুয়াংজু বন্দর থেকে চট্টগ্রামে আসা বিভিন্ন কোম্পানির জাহাজগুলো গত জুন মাসে কনটেইনারে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়িয়েছে। কনটেইনারের ধরন ভেদে (জাহাজ কোম্পানি ও পরিবহন সময়ভেদে) সর্বনিম্ন ৫০ থেকে ২৭৫ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ভাড়া বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, টাকার অঙ্কে দেশে আমদানি করা মোট পণ্যের সাড়ে ২৬ শতাংশ আসে চীন থেকে।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতি মাসে গড়েএক লাখ কনটেইনার (প্রতিটি ২০ ফুট লম্বা) পণ্য আমদানি হয়। প্রতি কনটেইনারে সারচার্জ বা বাড়তি ভাড়ার নামে গড়ে ১০০ ডলার করে আদায় করা হলে মাসে ৮০ কোটি টাকা বাড়তি খরচ হবে ব্যবসায়ীদের।

বন্দর ব্যবহারকারী ফোরাম ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, এই বাড়তি ভাড়া ব্যবসায়ীরা পরিশোধ করলেও দিন শেষে ভোক্তাকেই বহন করতে হবে। বন্দরে এখন যে জট তা অব্যাহত থাকলে সামনে ব্যবসা করাই কঠিন হয়ে পড়বে।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান গত ২২ জুন চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানকে দেওয়া এক চিঠিতে উল্লেখ করেন, জাহাজ জেটিতে ভিড়তে গড়ে সাত-আট দিন এবং পণ্য খালাস করতে আরও আট-দশ দিনসহ ১৫-২০ দিন সময় লাগছে। তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য এটি মহাবিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। যথাসময়ে পণ্য না পেয়ে বিদেশি ক্রেতারা হতাশা প্রকাশ করেছেন। এইচ অ্যান্ড এমসহ বিদেশি ক্রেতাদের একটি প্রতিনিধিদল বন্দরের সমস্যা নিয়ে বিজিএমইএর সভাপতির সঙ্গে বৈঠকের পর এই চিঠি দেওয়া হয়।

চলতি বছরের মে মাসে বন্দরের বহির্নোঙর থেকে জেটিতে ভিড়তে প্রতিদিন গড়ে অপেক্ষায় থেকেছে ১০টি জাহাজ। জুন মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রতিদিন ১৬টিতে। জুলাই মাসের ১ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ১৭টি জাহাজ পণ্য নিয়ে বহির্নোঙরে অপেক্ষায় থেকেছে। অথচ গত বছর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮টি জাহাজ বহির্নোঙরে পণ্য নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। সাধারণত একটি জাহাজে গড়ে ১ হাজার কনটেইনারে বিভিন্ন ধরনের আমদানি পণ্য থাকে।

জাহাজজটের কারণে দেরিতে আমদানি করা পণ্য পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তৈরি পোশাক খাত। পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, চীন, শ্রীলঙ্কা, ভারত কিংবা কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর বন্দরে জাহাজজটের সমস্যা নেই। কাঁচামাল আমদানি ও রপ্তানিতে তাদের তুলনায় দেশীয় উদ্যোক্তারা এখন গড়ে এক থেকে দুই সপ্তাহ পিছিয়ে পড়েছেন।

বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পোশাক খাতের প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে বন্দর-সুবিধায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় এখন ব্যবসা হারাতে হচ্ছে। বন্দর-সুবিধা না বাড়ালে পোশাক খাতের ব্যবসা এ দেশে থাকবে না।

বন্দর ব্যবহারকারী আমদানি ও রপ্তানিকারক বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বন্দরে জাহাজজটের মূল কারণ হচ্ছে অবকাঠামো-সংকট। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বন্দর দিয়ে ২১ লাখ ৮৯ হাজার কনটেইনার পরিবহন হয়। বিদায়ী অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৪ লাখ ১৯ হাজারে। যে পরিমাণ কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে তার জন্য বছরে অন্তত একটি করে নতুন জেটি দরকার। অথচ ২০০৭ সালের পর বন্দরে সমুদ্রগামী কনটেইনার জাহাজের জন্য জেটি নির্মাণ হয়নি। উল্টো ঈদের আগে দুর্ঘটনায় দুটি গ্যান্ট্রি ক্রেন (জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর যন্ত্র) অচল হয়ে পড়ায় একটি জেটির সুবিধা কমেছে।

খুব দ্রুতগতিতে এখনই নির্মাণকাজ শুরু করা হলেও নতুন জেটি চালু করতে তিন বছরের বেশি সময় লাগবে বলে জানান বন্দর ব্যবহারকারীরা। সামনে আরও ভয়াবহ জটের আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহনের ৯৮ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিবহন হয়। এই বন্দরে সমস্যা হলে দেশের অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরের ১২টি জেটি ব্যবহার করে কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম খালেদ ইকবাল প্রথম আলোকে বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে মে মাসে তিন দিন পণ্য ওঠানো-নামানো বন্ধ এবং দুটি গ্যান্ট্রি ক্রেন অচল হওয়ায় জাহাজের কিছুটা জট তৈরি হয়েছে। সক্ষমতা বাড়ানোর নানা কর্মসূচি নেওয়ায় দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে জাহাজের জট স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে তিনি জানান।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জাহাজ কোম্পানি মায়েসর্ক লাইনের সহযোগী সংস্থা এমসিসি ট্রান্সপোর্ট সিঙ্গাপুর লিমিটেড গত জুন মাসে তাদের ওয়েবসাইটে ‘গ্রাহক পরামর্শ’ বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম বন্দরের জটের কথা তুলে ধরে। এর মধ্যে গত ১৫ জুনের বিজ্ঞপ্তিতে ‘ইক্যুইপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট ইমপোর্ট সারচার্জ’ বাড়ানোর ঘোষণা দেয় কোম্পানিটি। এতে বলা হয়, চীনসহ উত্তর এশিয়া ও পূর্ব রাশিয়া থেকে চট্টগ্রামমুখী জাহাজে প্রতি কনটেইনারে ৬০০ মার্কিন ডলার আদায় করা হবে। গত বছরের ১০ নভেম্বর থেকে এই হার ছিল যথাক্রমে ৪৫০ ও ৪০০ ডলার।

জাহাজ কোম্পানিগুলোর কেউ সারচার্জের নামে আবার কেউ সরাসরি বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু করেছে বলে জানান রপ্তানিকারকদের স্বার্থরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপার্স কাউন্সিলের সভাপতি মো. রেজাউল করিম। বন্দর কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি করতে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক জাহাজ পরিচালনাকারী কয়েকটি কোম্পানির জোট এশিয়ান ফিডার ডিসকাশন গ্রুপ (এএফডিজি) গত ১৯ জুন চট্টগ্রামমুখী জাহাজে কনটেইনার পরিবহনে ১৫০ ডলার বাড়তি ভাড়া আরোপের ঘোষণা দেয়। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকে চট্টগ্রামমুখী কনটেইনার পরিবহনে সারচার্জ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে আরও কয়েকটি জাহাজ কোম্পানি।

 তবে সারচার্জ বা ভাড়া বাড়ানোর বিষয়টি জানা নেই বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এ রকম হলে জাহাজ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। জাহাজজট কমে গেলে এমনিতেই সারচার্জ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে বলে আশা করেন তিনি।

https://www.prothomalo.com/bangladesh/article/1256316