Tuesday, June 26th, 2018

গ্যাস-বিদ্যুতের চুরি কমাতে আগ্রহ কম

গ্যাস-বিদ্যুতের চুরি ও অপচয় কমানো এবং গ্রাহক প্রতারণা বন্ধে প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। বারবার লক্ষ্য ও সময়সীমা পরিবর্তন করেও প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের বিষয়টি কোনোভাবেই গতিশীল করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিতরণ করা সরকারি কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

গ্যাস ও বিদ্যুতের প্রত্যেক গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটার দেওয়ার সরকারি পরিকল্পনা প্রায় চার বছর আগের। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে ২ কোটি ২০ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক এবং প্রায় ৪০ লাখ গ্যাস গ্রাহককে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় আনার কথা রয়েছে। সরকারি লক্ষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যে বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার পাওয়া গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখে উন্নীত হওয়ার কথা। কিন্তু হয়েছে ১৩ লাখের কম।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার পাওয়া গ্রাহকের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখের কিছু বেশি। সে হিসাবে গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি জুন পর্যন্ত প্রায় নয় মাসে প্রি-পেইড মিটার পাওয়া গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছে মাত্র ৮ লাখ। এ অবস্থায় আগামী আড়াই বছরে ২ কোটি ২০ লাখ গ্রাহককে মিটারের আওতায় আনা প্রায় অসম্ভব।

আবাসিক খাতের একজন গ্রাহকের কাছ থেকে যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহারের হিসাব দেখিয়ে বিল নেওয়া হয়, গ্রাহকের ব্যবহার তার চেয়ে অনেক কম। ফলে গ্রাহক প্রতিনিয়ত ঠকছেন। যেসব এলাকায় প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, দুই চুলা ব্যবহারকারী একজন গ্রাহক দুই মাসে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকার গ্যাস ব্যবহার করেন। অথচ মিটার ছাড়া গ্রাহককে দুই মাসে দিতে হয় ১ হাজার ৬০০ টাকা।

গ্যাসের বর্তমান গ্রাহক (আবাসিক, শিল্প ও অন্যান্য) প্রায় ৪০ লাখ। পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে প্রি-পেইড মিটারের আওতায় এসেছে মাত্র ১০ হাজার গ্রাহক। আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক-নির্বিশেষে গ্যাস, বিদ্যুৎ উভয় ক্ষেত্রেই প্রি-পেইড মিটারের সুবিধা অনেক। এতে গ্রাহক রিচার্জ কার্ড ব্যবহার করে নিজের প্রয়োজন ও ইচ্ছেমতো গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবেন। আবার বিতরণ কোম্পানিগুলোও গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের আগেই বিল পাবে, যা এখন পায় প্রায় দুই মাস পর। বিল নিয়ে গ্রাহকের অভিযোগ ও হয়রানিরও অবসান হবে।

বিদ্যুতের প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কার্যক্রম সমন্বয় করছে মন্ত্রণালয়ের গবেষণা ও নীতি সহায়তা সংস্থা পাওয়ার সেল। জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের কার্যক্রম একটু পিছিয়ে পড়েছে ঠিকই। শিগগিরই এই কার্যক্রম গতিশীল করা হবে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রি-পেইড মিটার স্থাপনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি যতটুকু, তার সবই হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। গ্যাসের প্রি-পেইড মিটার দেওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি এলাকায় কয়েক হাজার মিটার দেওয়া হয়। এরপর বিষয়টি থেমে যায়। অথচ সরকারের পরিকল্পনায় আবাসিক গ্রাহকের জন্য প্রি-পেইড মিটার স্থাপন করা ছাড়াও ‘গ্যাসের উত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য’ সিএনজি ও শিল্প খাতে ইভিসি (ইলেকট্রনিক ভলিউম কারেক্টার) মিটার স্থাপন বাধ্যতামূলক। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো মিটার স্থাপন করা হয়নি। ফলে বিতরণ কোম্পানিগুলোর সরবরাহ করা গ্যাসের সঙ্গে গ্রাহকের ব্যবহৃত গ্যাসের পরিমাণগত বিশাল পার্থক্য থেকে যাচ্ছে। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকলে সিএনজি স্টেশন ব্যবহৃত ‘ভলিউমেট্রিক’ মিটারে ব্যবহৃত গ্যাসের প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারিত হয় না। কম গ্যাস ব্যবহার করেও তাঁরা বিল বেশি দেন। আর গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর হিসাবে তা ‘সিস্টেম গেইন’ (পদ্ধতিগত লাভ) হয়।

এ সম্পর্কে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ম. তামিম প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাস বিতরণের এই ব্যবস্থায় কোম্পানির লোকসান নেই। কেননা, তারা গ্যাস কম দিয়েও বিল ঠিকই পাচ্ছে। কিন্তু সিএনজি স্টেশন এবং শিল্পমালিকেরা বছরের পর বছর ধরে কেন এটা মেনে নিচ্ছেন, সেটি এক রহস্য। হয়তো বিলের বিষয়ে বিতরণ কোম্পানির অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁদের কোনো বোঝাপড়া থাকতে পারে। এতে ক্ষতি হচ্ছে দেশের। কারণ, এই ব্যবস্থায় প্রচুর পরিমাণ গ্যাস চুরি ও অপচয় হচ্ছে।

এদিকে যেসব বিদ্যুৎ গ্রাহক প্রি-পেইড মিটারের আওতায় এসেছেন, তাঁরা এক নতুন হয়রানির মধ্যে পড়েছেন। এই হয়রানি প্রি-পেইড কার্ড রিচার্জ করা নিয়ে। কারণ, নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের কিছু শাখা ছাড়া প্রি-পেইড মিটারের কার্ড রিচার্জ করার সুযোগ নেই। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, রাজধানীতে রিচার্জ করার জন্য অনুমোদিত ব্যাংক ও শাখা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় নির্দিষ্ট শাখায় গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়।

এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক বলেন, মিটারের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ানো এবং সাধারণ দোকান থেকে রিচার্জ করার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। পাশাপাশি মোবাইলের মাধ্যমে রিচার্জ করার পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।