Tuesday, June 19th, 2018

গতি নেই সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে

জ্বালানি সংকটের কারণে সরকার এলএনজি আমদানি করছে। কিন্তু সংকট মেটাতে দেশীয় গ্যাস উত্তোলনের গতি নেই। স্থলভাগ ও সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজের গতি এখন থমকে গেছে। দেশীয় তেল গ্যাস অনুসন্ধানের বদলে বিদেশ থেকে বেশি দামের এলএনজি আমানি করার দিকে ঝোঁক বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প থাকতেও সরকার বেশি মূল্যের জ্বালানি ব্যবহারের ফাঁদে পা দিচ্ছে। কিন্তু দেশের মানুষ উচ্চমূল্যের জ্বালানি ব্যবহারের জন্য কতটা প্রস্তুত, তা ভাবা হচ্ছে না।

বর্তমানে কেবল স্থলভাগ থেকে দৈনিক দুই হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস উত্তোলন করা হয়। এদিকে দেশের মোট গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার মিলিয়ন ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে ঘাটতি থাকছে এক হাজার মিলিয়ন মিলিয়ন ঘনফুট। বিপুল ঘাটতি মেটাতে এখন আমদানির বিকল্প নেই। কিন্তু ২০১০ থেকে পর্যায়ক্রমে উদ্যোগ নিলে এই ঘাটতি তৈরি হতো না বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদরুল ইমাম। তিনি বলেন, ‘গত আট বছরে এই ঘাটতি পূরণে সরকারের উদ্যোগ ছিল হতাশাজনক। তাই আজ এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। উচ্চ দামের এই গ্যাস আমদানি না করে এতদিন অনুসন্ধান করলে অনেক আগেই দেশের ভেতরেই গ্যাস পাওয়া যেতো। একজন ‍ভূ-তত্ত্ববিদ হিসেবে আমি নিশ্চিত, বাংলাদেশের মাটির নিচে অনেক গ্যাস আছে।’

বর্তমানে কক্সবাজারের মহেশখালীতে বসে আছে এলএনজি জাহাজ।চলতি মাসের মধ্যেই পাইপলাইনে এই গ্যাস সরবরাহের চেষ্টা করা হচ্ছে। এদিকে এই এলএনজির সঙ্গে সমন্বয় করতে এরইমধ্যে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিতরণ কোম্পানি। বর্তমানে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি শুরু করেছে বাংলাশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শুনানির ৯০ দিনের মধ্যেই দাম বাড়ানোর আশে দিতে পারে কমিশন। কমিশন গঠিত কারিগরি কমিটি বলছে এলএনজি আমদানির শুরুতেই ১৪৩ ভাগ গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাবে।তবে উচ্চমূল্যের এই জ্বালানি ব্যবহারের পরিবর্তে বিকল্প ব্যবস্থা করার সুযোগ থাকলেও জ্বালানি বিভাগ এবং পেট্রোবাংলা সে দিকে নজর নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপস ২০১৫ সালে তিন ব্লকে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়।২০০৮ সালে মার্কিন কোম্পানিটিকে কাজ দেয়া হয়।২০১০ এরপর ২০১৩ পর্যন্ত কয়েক ফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে কনোকো ফিলিপস সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। প্রত্যেকবারই তারা দরপত্রে অংশ নিয়েছে। সরকার বিভিন্ন সময়ে ছয়টি ব্লক তারে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু পরে দেখা যায় কনোকোই বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের তেল গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম ঝুলিয়ে দিয়েছে।

বঙ্গোপসাগরের ২০১২ সালের ১৪ মার্চ মিয়ানমারের কাছ থেকে একলাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গকিলোমিটার ও ২০১৪ সালের ৮ জুলাই ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা পেয়েছে। সব মিলেয়ে ব্লক পুনর্বিন্যাস করে ২৬ টি ব্লকে ভাগ করা হয় গোটা সমুদ্রসীমাকে।কিন্তু এখন এরমধ্যে মাত্র তিনটি ব্লকে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাকি ২৩ ব্লক পড়েই রয়েছে।

প্রসঙ্গত, বর্তমান ভারতীয় কোম্পানি অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন (ওএনজিসি) অগভীর সমুদ্রে ৪ এবং ৯ ব্লকে এবং কোরিয়ান কোম্পানি দাইয়ু গভীর সাগরের ১২ নম্বার ব্লকে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ করছে।

২০০৮ সাল থেকে সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে সরকার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু গত ১০ বছরে সব বড় উদ্যোগই থমকে আছে। সরকার সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভে করার উদ্যোগ নেয়। ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভের জন্য দুই দফা দরপত্র আহ্বান করা হয়। স্লামবার্জার নামে একটি বহুজাতিক কোম্পানি কাজও পায়। কিন্তু কোনও কারণ না দেখিয়ে জ্বালানি বিভাগ শেষ মুহূর্তে বাতিল করে দেয়।

এই প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘দেশের সাগরে ২৬টি ব্লক রয়েছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে তিনটি ব্লকে। কেন অনুসন্ধান কার্যক্রম গতিশীল নয়, তা আমাদের বোধগম্য নয়। সরকার উদ্যোগী হলে গ্যাস পাওয়া সম্ভব ছিল। মিয়ানমার তার সমুদ্রবক্ষে যেভাবে তেল গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করেছে এবং করে যাচ্ছে সে তুলনায় বাংলাদেশ যথেষ্ট পেছনে পড়ে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বেশি দামের গ্যাস আমদানি না করে দেশের গ্যাস উত্তোলনে সরকারকে আরও মনোযোগী হওয়া দরকার। তা না হলে গ্যাসের দাম প্রতিবছরই বাড়ানোর প্রস্তাব আসবে কমিশনের কাছে। আর কমিশনও দাম বাড়িয়েই যাবে।’

link: http://www.banglatribune.com/business/news/334849/