Saturday, January 4th, 2020

এলপি গ্যাসের দাম বাড়ছে আজ থেকে

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) প্রতিটি সিলিন্ডারের দাম একলাফে ২০০ টাকা বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সারাদেশে আজ শনিবার থেকে এই বর্ধিত মূল্য কার্যকর হবে। খুচরা বাজারে আজ থেকে ভোক্তাদের প্রতি সিলিন্ডার (১২ কেজি) কিনতে হবে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ১২০ টাকা দরে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ভোক্তারা এসব সিলিন্ডার ৯০০ থেকে ৯২০ টাকায় কিনতে পারতেন।

পাইপলাইনের গ্যাসের স্বল্পতায় শহরে-মফস্বলে জনপ্রিয় হচ্ছে তরল এলপিজি। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বিপাকে পড়তে হচ্ছে গ্রাহককে। পূর্বঘোষণা ছাড়াই যখন তখন এর দাম বাড়াচ্ছে বেসরকারি এলপি গ্যাস সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো।

দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়ার মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার থেকে বাজারে এলপিজির সংকট দেখা যায়। পরিবেশকরা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে এলপিজি সরবরাহ বন্ধ করে দেন। ফলে খোলাবাজারে শুক্রবার এলপি গ্যাসের সংকট দেখা দেয়।

সমকালের বরিশাল ব্যুরো জানিয়েছে, আজ থেকে কোম্পানি ভেদে প্রতিটি সিলিন্ডারের পাইকারি দাম হবে এক হাজার ৫০ থেকে এক হাজার ৭০ টাকা পর্যন্ত। খুচরা বিক্রেতারা ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করবেন আরও ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে। ফলে আজ থেকে ভোক্তাকে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হবে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ১২০ টাকায়।

এ প্রসঙ্গে যমুনা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলায়েত হোসেন সমকালকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টনে এলপিজি কাঁচামালের দাম ১৩২ ডলার বেড়েছে। তাই তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, দাম কমলে ভোক্তারাও কম দামে এলপিজি পাবেন।

এলপি গ্যাস ওমেরার বরিশালের পরিবেশক মাহফুজুর রহমান বলেন, সব কোম্পানিই ১২ কেজির সিলিন্ডার-প্রতি ২০০ টাকা দাম বাড়িয়েছে। কোম্পানিগুলো ১ জানুয়ারি থেকে পুরোনো দরে পরিবেশকদের গ্যাস দিতে চাচ্ছে না। তাই তারাও খুচরা বিক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস দিতে পারছেন না।

বরিশাল নগরীর গোঁড়াচাঁদ দাস রোডে খুচরা বিক্রেতা চৌধুরী ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী জহিরুল ইসলাম চৌধুরী জানান, গত বৃহস্পতিবার থেকে স্থানীয় পরিবেশকরা তাদের গ্যাস সরবরাহ করছেন না। বেশিরভাগ পরিবেশকের মোবাইল নম্বরও বন্ধ ছিল। অনেকে ফোন ধরলেও সিলিন্ডার সরবরাহ না করার জন্য নানা অজুহাত দেখিয়েছেন। প্রতিবারই দাম বাড়ানোর আগে স্থানীয় পরিবেশকরা এ কৌশল নেন। এর আগে গত ১৭ নভেম্বর প্রতিটি সিলিন্ডারের পাইকারি দাম একবারে ১২০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। যদিও তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টনে মাত্র ১০ ডলার দাম বেড়েছিল।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান ছামসুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে দাম বাড়ে সে অনুযায়ী দেশীয় বাজারে দাম বাড়ানো উচিত। তিনি জানান, এক টন এলপিজিতে ৮২ বোতল (১২ কেজির) এলপিজি ভরা যায়।

এই দাম বৃদ্ধির পেছনে সরকারের নিয়ন্ত্রণহীনতাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, এলপিজি ব্যবসায়ীদের সব সময় নানা সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার। আর ব্যবসায়ীরা ইচ্ছে মতো দাম বাড়িয়ে গ্রাহকদের পকেট কাটছে। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে এ বিষয়ে একাধিকবার বলা হয়েছে। কিন্তু তারাও কোনো ভূমিকা রাখছে না।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এলপিজির দাম নির্ধারণে সরকার নানাভাবে চেষ্টা করলেও বিনিয়োগকারীরা মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের হস্তক্ষেপ মানতে নারাজ।

চাহিদা অনুযায়ী দেশে বার্ষিক ১৫ লাখ টনের বেশি এলপিজি সরবরাহ দরকার। তবে আমদানি ও বিক্রি হচ্ছে বার্ষিক প্রায় ১০ লাখ টন। এর মধ্যে ২০ হাজার টন এলপিজি সরকারিভাবে বিক্রি হয়। বেসরকারি যেসব কোম্পানি এলপিজি গ্যাস বিক্রি করছে সেগুলো হচ্ছে- যমুনা, বসুন্ধরা, ক্লিনহিট, টোটাল, ওরিয়ন, পেট্র্রোম্যাক্স, লাফার্স, জি-গ্যাস, ডেলটা, নাভানা ইত্যাদি।

এলপিজির বাজারের বেশিরভাগ নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি এলপিজি সরবরাহকারীরা। দেশের মোট এলপিজির মাত্র দুই শতাংশ জোগান দেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। প্রতিদিন চার হাজার বোতল এলপিজি সরবরাহ করা হয় সরকারিভাবে, যা দিয়ে এত বড় বাজারে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব নয়। জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, তারা কোম্পানিগুলোকে অনুরোধ করেছিলেন, যাতে সর্বোচ্চ খুচরা দাম বোতলের গায়ে লিখে দেওয়া হয়। তারা সহজেই এটি করতে পারে। এতে শেষ প্রান্তের গ্রাহক এলপিজি সঠিক দামে পেতে পারেন। দেশের প্যাকেটজাত সব পণ্যেই সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লেখা থাকে। কিন্তু এলপিজি সিলিন্ডারের গায়ে দাম লিখতে ব্যবসায়ীরা রাজি হচ্ছেন না। তারা বলছেন, যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর বিষয়টি নির্ভরশীল, তাই এলপিজির মূল্য এভাবে লিখে দেওয়া সম্ভব নয়।

সরকারিভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) এবং ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট এবং বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলো কনডেনসেট প্রক্রিয়ায় এলপিজি সরবরাহ করে। অন্যদিকে বিদেশ থেকে প্রোপেন এবং বিউটেন আমদানি করে বেসরকারি উৎপাদনকারীরা নির্দিষ্ট অনুপাতে বোতলে ভোরে এলপিজি বিক্রি করে থাকেন। দেশের বেশিরভাগ এলপিজিই আমদানি করা হয়। সৌদি আরামকো এলপিজির দর অনুসারে জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে প্রতি টন প্রোপেনের দাম ৬৬৫ ইউএস ডলার, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ৪৪০ ডলার। প্রতিটন বিউটেনের দাম এখন ৫৯০ ডলার, যা গত মাসে ছিল ৪৫৫ ডলার।