Thursday, July 12th, 2018

অ্যামোনিয়া গ্যাস নি:সরণে বিপর্যস্ত আশুগঞ্জ

 
ইউরিয়া সার উৎপাদনের জন্য প্রায় ১০ হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যামোনিয়া মজুত রয়েছে ট্যাংকে। গ্যাসের চাপ বেড়ে গেলে ট্যাংকের ভেতরের তরল অ্যামোনিয়া গ্যাস এই ট্যাকের ওপরের স্তরের নিরাপত্তা ডিভাইস দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে (দেখতে সাদা ধোঁয়ার মতো) নির্গত হয়। বাতাসের গতি যেদিকে, অ্যামোনিয়া গ্যাস দ্রুত সেদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ছবি: শাহাদৎ হোসেন

ইউরিয়া সার উৎপাদনের জন্য প্রায় ১০ হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যামোনিয়া মজুত রয়েছে ট্যাংকে। গ্যাসের চাপ বেড়ে গেলে ট্যাংকের ভেতরের তরল অ্যামোনিয়া গ্যাস এই ট্যাকের ওপরের স্তরের নিরাপত্তা ডিভাইস দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে (দেখতে সাদা ধোঁয়ার মতো) নির্গত হয়। বাতাসের গতি যেদিকে, অ্যামোনিয়া গ্যাস দ্রুত সেদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ছবি: শাহাদৎ হোসেন

ব্রাহ্মণবাড়িয়া্র আশুগঞ্জ সার কারখানার এক কিলোমিটার দূরে থাকতেই উৎকট গন্ধ নাকে ঝাপটা মারল। সামনে এগোতেই গন্ধের তীব্রতা বাড়তে লাগল। কাছাকাছি পৌঁছালে একসময় চোখ জ্বালা করতে লাগল এবং পেটও মোচড় দিয়ে উঠল। মুখে কাপড় চেপে দ্রুত এগোতে হলো।

ওই তীব্র দুর্গন্ধ আর ঝাঁজের কারণ জানতে চাইলে স্থানীয় লোকজন জানান, সার কারখানা অ্যামোনিয়া গ্যাস ছেড়ে দেওয়ায় এ পরিস্থিতি। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, ২ জুলাই থেকে অ্যামোনিয়া গ্যাস ছাড়া শুরু হলে এলাকাবাসী প্রতিবাদ জানান, কারখানার সামনে বিক্ষোভ করেছেন এবং স্মারকলিপি দিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি। দূষণ থামাতে সার কারখানা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এলাকাবাসীর মধ্যে এই মারাত্মক দূষণ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার চরচাতলা ইউনিয়নে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আধা কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীর তীর ঘেঁষে ইউরিয়া সারের এই কারখানা।

স্থানীয় লোকজন ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে আশুগঞ্জ সার কারখানার আশপাশের ৬০টি পরিবার টিকতে না পেরে এলাকা ছেড়েছে। ওই এলাকায় দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ করছেন দেশি-বিদেশি কর্মীরা। তাঁদের কেউ কেউ অসুস্থ হয়েছেন। অনেকে এলাকাও ছেড়েছেন। যাঁরা এখনো এলাকায় আছেন, তাঁরা শ্বাসনালি, চোখ ও নাক জ্বালাপোড়া, ফুসফুস ও খাদ্যনালিতে প্রদাহসহ মারাত্মক সব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, ‘অ্যামোনিয়া ক্ষারধর্মী গ্যাস। এটি সহজেই পানির সঙ্গে মেশে। যদি এ গ্যাস উড়ে যেত, তবে ক্ষতি কম হতো। কিন্তু জলীয় অংশে এটি লেগে থাকে। এখানেই বড় বিপদ।’

আ ব ম ফারুক বলেন, অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে চামড়া ও কিডনির সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধ লোকজনরা এর সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারেন।

অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে মিডল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানির ভেতরের অসংখ্য গাছপালা মরে যাচ্ছে। গাছের পাতা মরে কালো হয়ে গেছে। ৬ জুলাই, আশুগঞ্জ ছবি: শাহাদৎ হোসেন।

অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে মিডল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানির ভেতরের অসংখ্য গাছপালা মরে যাচ্ছে। গাছের পাতা মরে কালো হয়ে গেছে। ৬ জুলাই, আশুগঞ্জ ছবি: শাহাদৎ হোসেন।

অ্যামোনিয়া গ্যাস নির্গমন বন্ধ করতে আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (এএফসিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া লিখিত দরখাস্তে বলা হয়েছে, ২৫ জুন থেকে এএফসিসিএল থেকে অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যামোনিয়া গ্যাস নির্গত হচ্ছে। এর প্রভাবে বিদেশি শ্রমিক-কর্মকর্তারা এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। অনেকে অ্যামোনিয়া গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। চিঠিতে বলা হয়, অবিলম্বে এই বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ করা না হলে পুরো এলাকায় মহামারি নেমে আসবে।

আশুগঞ্জ সরকার কারখানার উত্তর-পশ্চিমে ১৫০ থেকে ২০০ গজের মধ্যে মিডল্যান্ড ইস্ট পাওয়ার লিমিটেড এবং মিডল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড নামে দুটি কোম্পানি গ্যাসভিত্তিক ৫১ মেগাওয়াট ও ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে।

মিডল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) শামিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাসের কারণে তাঁদের কেন্দ্রের ভেতরের সব গাছের পাতা পুড়ে গেছে।

আশুগঞ্জের চরচারতলা এলাকায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) একটি ফাস্ট ট্র্যাক (আইপিপি) প্রকল্পের আওতায় মিডল্যান্ড ইস্ট পাওয়ার লিমিটেড (এমইপিএল) নির্মাণাধীন ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলছে। এখানে বাংলাদেশ ও চীনের প্রায় ৭০০ কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে ২০০ কর্মী চীনের। ২ জুলাই চীনা কর্মী গুয়া দাউই, সং জওলিনি, ওয়াং জংলয়িন, চপন জনিবনি ও মসি জাই লনি গ্যাসের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁরা বমি শুরু করলে আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিআরআরসি জয়িং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক ম. বায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘যখন গ্যাস বের হয়, তখন শ্রমিকেরা কাজ করতে চান না। তাঁদের শ্বাসকষ্ট হয়। চোখ মেলতে পারেন না। এভাবে গ্যাস বের হতে থাকলে আমরা এখানে কাজ করব না।’

গ্যাস নিঃসরণ বন্ধের জন্য এই বিদ্যুৎ কোম্পানি আশুগঞ্জ সার কারখানাকে একাধিক চিঠি দেয়। সর্বশেষ ৫ জুলাই মিডল্যান্ড ইস্ট পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ আলম আশুগঞ্জ সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান। চিঠিতে বলা হয়, অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে নির্মাণাধীন ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের দেশি-বিদেশি প্রায় ৭০০ কর্মীর বড় অংশ মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বেশ কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আমির খান, উসমান মিয়া ও পলাশ মিয়া নামের মিডল্যান্ডের তিন কর্মী বলেন, গ্যাসের কারণে বুকে ব্যথা করে। কাজ করতে পারেন না। পেটের দায়ে কাজ করছেন তাঁরা।

আগে মেঘনা নদীর ঘাটে অ্যামোনিয়া গ্যাস স্টোরেজ ট্যাংকসংলগ্ন এলাকায় (বর্তমানে মিডল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি) জাকির মিয়া, আমির খান, সোহরাব মোল্লা, মোক্তার মিয়া, এলেম খাঁ, পরলন খাঁ, আবু জাহিদ, মো. নাসির উদ্দিন, ফুল মিয়া, আবু সাইদ, ফজুল মিয়া, বোধাই মিয়া, সোনা মিয়াসহ অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার থাকত। গ্যাসের কারণে টিকতে না পেরে তারা এখন চরচারতলা পুকুরপাড় এলাকায় বসতি সরিয়ে নিয়েছে।

জাকির মিয়া জানান, ‘১০-১২ বছর ধরে আমরা এই যন্ত্রণায় ভুগছি। কতবার আন্দোলন করেছি, কারখানার এমডির গাড়ি অবরোধ করেছি, তবু কোনো কাজ হয়নি।’

অধ্যাপক আ ব ম ফারুক মনে করেন, আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার থাকলে অ্যামোনিয়া এভাবে ছড়াত না। কর্তৃপক্ষের নজরদারির নিশ্চয়ই অভাব আছে।

অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে কর্মীরা মাস্ক লাগিয়ে কাজ করছেন। ছবি: শাহাদৎ হোসেন

অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে কর্মীরা মাস্ক লাগিয়ে কাজ করছেন। ছবি: শাহাদৎ হোসেন

জানতে চাইলে আশুগঞ্জ সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ শাহ কামরান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কারখানাটি ১৪ মাস গ্যাসের অভাবে বন্ধ ছিল। গত ৮ জুন আমরা কারখানাটি চালু করেছি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সামান্য কিছু গ্যাস বের হতে পারে। এটা নিয়ে কেউ কেউ অভিযোগ করেছে। তাদের আমরা আশ্বস্ত করেছি, আর কোনো সমস্যা হবে না। এখন তো আমরা কারখানার ভেতরে আছি, কোনো দুর্গন্ধ পাচ্ছি না।’

এ ব্যাপারে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমি বাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্যাসের কারণে এলাকাবাসীর সমস্যার কথা আমাদের কেউ লিখিতভাবে জানায়নি। তবে আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তথ্য পেয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তারা বলেছে, সেখানে কোনো সমস্যা নেই। তবে আমি লোক পাঠিয়ে খোঁজ নেব।’

গত বছরও এভাবে অ্যামোনিয়া গ্যাস নিঃসরণ হয়েছিল। তখন মিডল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানির কেন্দ্রের ভেতরে প্রায় ৩০টি ছাগল, ১৫টি ভেড়া অ্যামোনিয়া গ্যাসের কারণে মারা যায়।

তখন (২০ মার্চ, ২০১৭) মিডল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করে। তদন্ত করে পরিবেশ অধিদপ্তর তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, সার কারখানা থেকে অতিমাত্রায় অ্যামোনিয়া গ্যাস নিঃসরণের কারণে মিডল্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের ভেতরের গাছপালা ও ছাগল রোগাক্রান্ত হচ্ছে। এটি এলাকার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এ ধরনের কার্যক্রম পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। দ্রুত অ্যামোনিয়া গ্যাস নিঃসরণ বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর আশুগঞ্জ সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠিও দেয়।